শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সময় : রাত ৮:০৮

আলোচনায় ‘কিছুটা অগ্রগতি হইয়াছে।…..। এই মুহুর্তে ইহার চাইতে বেশি কিছু আমার বলিবার নাই।সময় আসিলে আমি অবশ্যই বিস্তারিত বলিব।’


প্রকাশের সময় :১৯ মার্চ, ২০২১ ৯:২৮ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানঃ
মুজিব-ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা আলোচনায় তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায় নি শুধু উপদেষ্টা পর্যায়ের কমিটি গঠন ছাড়া। সামরিক সরকার একদিকে বলছে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জয়দেবপুরে সেনাবাহিনীর গুলীতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধু জয়দেবপুরের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানান। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ভূট্টো বিরোধী জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলার জনগণ বসে থাকে নি। তারা আস্তে আস্তে চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকে। সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ বেসামরিক লোকদের সাথে যোগাযোগ করে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। ১৯শে মার্চের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ২০শে মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক নিম্নোক্ত সংবাদগুলো পরিবেশন করেঃ

শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীসহ অদ্য মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক
একদিন বিরতির পর গতকাল (শুক্রবার) ঢাকাস্থ প্রেসিডেন্ট ভবনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে তৃতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা ৯০ মিনিটকাল স্থায়ী হয় এবং আলোচনাকালে কোন পক্ষেই অন্য কেহ উপস্থিত ছিল না। আজ শনিবার সকাল দশটায় মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনাক্রমের চতুর্থ অধিবেশন অনুষ্ঠানের কথা আছে। গতকাল সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টভবনে সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা ও শেখ মুজিবর রহমানের উপদেষ্টাদের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পর শেখ সাহেবের বাসভবনে জনাকীর্ণ এক সাংবাদিক সম্মেলনে গতকল্যকার আলোচনা সম্পর্কে শৈখ মুজিবুর রহমান বলেন, আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেড়ঘন্টা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছি। আমাদের আলোচনা অব্যাহত থাকিবে। আমরা আগামীকাল সকাল দশটায় প্রেসিডেন্টভবনে আবার আলোচনায় বসিব। তৎপূর্বে উপদেষ্টা পর্যায়ে ও তাঁহাদের সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয় এবং উহা সোয়া দুইঘন্টা স্থায়ী হয়। এই সময় প্রেসিডেন্ট ভবনের সামরিক বেষ্টনীর বাইরে বিপুল জনতা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করিতে থাকে। গত চারদিনের মধ্যে সেখানে এত লোকের সমাগম আর কখনও হয় নাই।

গত শুক্রবারে জয়দেবপুরের সেনাবাহিনী ও জনতার সংঘর্ষের নয়া প্রেক্ষিতেই সম্ভবত: অধিকতর সংখ্যায় জনতাকে প্রেসিডেন্ট ভবনের কাছে টানিয়া আনে। গতকল্যকার আলোচনাশেষে প্রেসিডেন্ট ভবন হইত বাহির হইয়া আসিলে জনতা সমস্বরে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দ্বারা তাঁহাকে সম্বর্ধনা জানায়। এই সময়ে নেতাকে প্রফুল্ল দেখাইতেছিল। পরে স্বীয় বাসভবনে ফিরিয়া দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে শেখ সাহেব বলেন, আমাদের আলোচনা চলিতেছে। আলোচনায় ‘কিছুটা অগ্রগতি হইয়াছে।…..। এই মুহুর্তে ইহার চাইতে বেশি কিছু আমার বলিবার নাই। সময় আসিলে আমি অবশ্যই বিস্তারিত বলিব।’ বৈঠকে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন সম্পর্কে আলোচনা হইয়াছে কিনা জানিতে চাওয়া হইলে শেখ সাহেব বলেন, ‘আলোচনা চলিতেছে।

আলোচনা শেষ হইলেই কর্মপন্থা স্থির হইবে।’ আলোচনায় তিনি সন্তষ্ট কিনা প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলেন, কিছুটা অগ্রগতি হইয়াছে, আমার এই মন্তব্য হইতেই আপনারা বুঝিয়া নিতে পারেন।’ কতদিন এই আলোচনা চলিবে জিজ্ঞাসা করা হইলে শেখ সাহেব বলেন, আলোচনা অনির্দিষ্টকাল ধরিয়া চলিতে পারে না। তিনি বলেন আমরা একটা সমাধানে পৌঁছিবার চেষ্টা করিতেছি। তিনি জয়দেবপুরের ঘটনার প্রতি প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন কিনা এবং এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া কি প্রশ্ন করা হইলে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, হ্যাঁ। প্রেসিডেন্ট এদিকে দৃষ্টি দিবেন। আলোচনায় পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পৃথক পৃথকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করিবেন। যদি দরকার হয়, পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সঙ্গে আমরা একত্রে বসিয়াও আলোচনা করিতে পারি।’
গতকল্যকার বৈঠকে শেখ সাহেবের সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খোন্দকার মোসতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, জনাব কামরুজ্জামান, জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন। অপরদিকে আলোচনায় প্রেসিডেন্টকে সহায়তা করেন বিচারপতি মি. এ. আর. কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান।

জয়দেবপুরে জনতায়-সেনাবাহিনীতে সংঘর্ষঃ অন্যূন ৩ জন নিহতঃ সান্ধ্য আইন জারি-
গতকাল (শুক্রবার) ঢাকা হইতে ২০ মাইল দূরে জয়দেবপুর ও আশেপাশের এলাকায় সেনাবাহিনীর গুলীতে কমপক্ষে ২০ ব্যক্তির মৃত্যু ও বহুলোক আহত হইয়াছে বলিয়া খবরে প্রকাশিত হইয়াছে। ঘটনার পর গতকাল সন্ধ্যা হইতে আজ সকাল পর্যন্ত জয়দেবপুরে কারফিউ জারি করা হইয়াছে।

ইহাই কি তবে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া লওয়ার নমুনা! জয়দেবপুরের ঘটনা সম্পর্কে ‘আহাম্মকের স্বর্গের বাসিন্ধাদের’ উদ্দেশে শেখ মুজিব

বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমান জয়দেবপুর সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচারে গুলী করিয়া হতাহত করার তীব্র নিন্দা করিয়া বলেন, যাহারা মনে করেন যে, বুলেট বা শক্তি প্রয়োগের দ্বারা গণ-আন্দোলন স্তদ্ধ করা যাইবে তাঁহারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করিতেছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় স্বীয় বাসভবনে সমবেত দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে শেখ সাহেব বলেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রচার করিয়াছেন যে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়ানেওয়া হইয়াছে। কিন্তু উহাই যদি সত্য হয় তবে জয়দেবপুরের এক বাজারে গিয়া সেনাবাহিনী নিরস্ত্র নাগরিকদের উপর গুলী চালাইর কি ভাবে? তিনি বলেন, ঢাকায় অবস্থানরত প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে আমি এই প্রশ্নের জবাব চাই।

জয়দেবপুরের গুলী বর্ষণের ঘটনাকে অহেতুক উস্কানীমূলক তৎপরতা বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া শেখ সাহেব বলেন, বাংলা দেশের মানুষ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তাহারা শক্তি প্রয়োগকে ভয় করে। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, পরিণতি যাই হউক, জনগণের আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে। তিনি বলেন, জনগণ রক্ত দিতে, প্রাণ দিতে শিখিয়াছে। তাহাদের আর দাবাইয়া রাখার সাধ্য কাহারও নাই।….।

পশ্চিম পাকিস্তানে ভূট্টো বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ
পশ্চিম পাকিস্তানের স্বতন্ত্র দলীয়রাসহ সকল সংখ্যালঘু দল দেশের বর্তমান শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থনদান করিতে পারেন বলিয়া মনে হইতেছে। মি: ভূট্টোর পিপল্স পার্টির বিরুদ্ধে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনের জন্য আগামী ২০শে মার্চ করাচীতে স্বতন্ত্র ও সংখ্যালঘু দলীয়দের একটি কনভেনশন আহ্বান করা হইয়াছে।

এরূপ আভাস পাওয়া যাইতেছে যে, কাইয়ুমপন্থী মুসলিম লীগ প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম কানও এই কনভেনশনে যোগদান করিতে পারেন। তিনি যোগদান করিরে ইহাই বুঝা যাইবে যে, তিনি মিঃ ভূট্টোর প্রভাবমুক্ত হইতে পারিয়াছেন। উপরোক্ত কনভেনশনে এ পর্যন্ত মোট ৫৫ জন এম. এন. এ’কে আমন্ত্রণ জানান হইয়াছে। কনভেনশনের আহ্বায়ক মওলানা শাহ আহমদ নুরানী বলেন, ইহাদের মধ্যে অন্তত: ৪৫ জন এম. এন. এ অবশ্যই যোগদান করিবেন এবং এই ৪৫ জন যোগদান করিলেও তাহা মিঃ ভূট্টোর বিরুদ্ধে একটি বিরাট বিজয় বলিয়া পরিগণিত হইবে।

উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সম্পর্কে আলোচনাকল্পে বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টারা গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকাস্থ প্রেসিডেন্টভবনে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক দুই ঘন্টা স্থায়ী হয় এবং ইহাতে উভয়পক্ষের তিনজন করিয়া সদস্য যোগদান করেন।…

অবিলম্বে মুজিবকে ক্ষমতা দাও- ভাসানী
ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়া শেখ মুজিবকে তত্তাবধায়ক সরকার গঠন করিতে দিবার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। ন্যাপ প্রধান ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তৃতা করিতেছিলেন। তিনি বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান উপরোক্ত উপদেশ গ্রহণ করিয়াই কেবল পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করিতে এবং ১২ কোটি মানুষের ঐক্য বজায় রাখিতে পারেন।…। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার জানা উচিত যে, তিনি জনগণের প্রতিনিধি নন। সুতরাং জনগণের উপর র্র্কতৃত্ব করার কোন অধিকারও তাঁহার নাই।

প্রাক্তন বাঙ্গালী সৈনিকদের সংযুক্ত মুক্তিবাহিনী গঠনের আহ্বান
বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা বাংলা দেশে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের গতকাল ১৯তম দিবস অতিবাহিত হয়। যে সকল অফিস খোলা রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দান করিয়াছেন, কেবল ঐগুলি ছাড়া আর সকল সরকারী, আধা-সরকারী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিগণ অফিস-আদালত বর্জন করিয়া শান্তি ও সুশৃংখলভাবে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন চালাইয়া যাইতেছেন।

গতকাল বিকালে নৌবাহিনীর সাবেক সৈনিকদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশ কমান্ডার (অবসরপ্রাপ্ত) জনাব জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নৌবাহিনীর প্রাক্তন সৈনিক মেসার্স আইয়ুব হোসেন, এম. এ. হোসেন, লে: সিদ্দিকী প্রমুখ বক্তৃতা করেন। বক্তাগণ বাংলার স্বাধিকার রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর বাঙালী সৈনিকগণকেই কেবল বাংলাদেশে নিযুক্ত রাখার জন্য দাবী জানান।

লেখকঃ পরিচালক প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

ট্যাগ :