রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সময় : বিকাল ৫:২৬

এক ফেসবুক প্রেমের করুন পরিনতি;ফেসবুক আইডি হ্যাক অতঃপর আত্মহত্যা!


প্রকাশের সময় :১০ মার্চ, ২০২১ ১০:০৪ : অপরাহ্ণ
ডেস্ক রিপোর্টঃ
এক ফেসবুক প্রেমের করুন পরিনতি! ফেসবুক আইডি হ্যাক অতঃপর আত্মহত্যা! শ্রাবন্তী (ছদ্মনাম) আছে মহা দুর্ভাবনায়। তার ফেসবুক আইডিটি হ্যাক হয়ে গেছে। কয়েকজনের পরামর্শে সে সাতক্ষীরা সদর থানায় গিয়ে একটি জিডি করে আসলো। এর দুই দিন পর শ্রাবন্তীর বান্ধবী মৌসুমী তার কিছু বন্ধু-বান্ধবসহ শ্রাবন্তীর বাসায় এসে অত্যন্ত আজেবাজে ভাষায় গালাগালি করে যায়। সে রাতেই শ্রাবন্তী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। আর তারপরের দিন শ্রাবন্তীর বাবা মৌসুমী এবং ৪-৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দেন থানায়।

ফেসবুক আইডি হ্যাক অতপর আত্মহত্যার ঘটনার তথ্য একটি অনলাইন পত্রিকায় দেখতে পেয়ে কাজে নামে সাইবার পুলিশ সেন্টার, সিআইডি। প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে তারা দেখতে পায় হ্যাক হয়ে যাবার পরে আইডিটি চালানো হয়েছে চট্টগ্রামের কোন একটি জায়গা থেকে। সে সকল তথ্য অ্যানালিসিস করে সাইবার মনিটরিং ইউনিটের একটি বিশেষ টিম চট্টগ্রামের অভিযান চালিয়ে আটক করে জয় চক্রবর্তীকে। তার ডিভাইস ব্যবহার করেই হ্যাকিং এবং হ্যাকিং পরবর্তী কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে জানায় উক্ত ঘটনার সময় তার এক বন্ধু তার বাসায় এসে চার থেকে পাঁচ দিন অবস্থান করে। আর সৌরভ নামক তার ঐ বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়।

এ সূত্র থেকে অভিযান টিম নিশ্চিত হয় এই সকল ঘটনার পেছনে সৌরভেরই হাত রয়েছে। গ্রেফতার করা হয় সৌরভকে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হ্যাক হওয়া আইডি উদ্ধার করা হয় এবং বেরিয়ে আসে অন্যরকম একটি কাহিনী।

ঘটনার পেছনের ঘটনা:
বছর দুয়েক আগে শ্রাবন্তী তার বান্ধবী মৌসুমির ছবি ব্যবহার করে একটি ফেক আইডি তৈরি করে। সেই আইডি ব্যবহার করে সে বিভিন্ন জনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর ভেতরে কিছু সম্পর্ক প্রেমের দিকে গড়ায়। তবে শ্রাবন্তী এ ব্যাপারে সব সময় খুবই সচেতন ছিল। সে কখনোই লাইভে আসতো না বা কারো সাথে দেখা করতে বাইরে যেত না। যখন কেউ তার ছবি চাইতো তখন সে তার বান্ধবী মৌসুমীর ফেসবুক আইডি থেকে ছবি নিয়ে সেগুলোই সে তাদের সাথে শেয়ার করত।

এভাবে সে বেশ কয়েকজনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। সৌরভ ও তাদের একজন। সৌরভের সাথে শ্রাবন্তীর প্রেমের সম্পর্ক প্রায় দুই বছরের। বিভিন্ন কারণে সৌরভের একসময় মনে হয় যে শ্রাবন্তীর হয়তো সে ছাড়া অন্য কারো সাথে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে কিন্তু সে ভুলেও সন্দেহ করেনি ছবির এই শ্রাবন্তী আর বাস্তবের শ্রাবন্তী ভিন্ন। সন্দেহের একপর্যায়ে সৌরভ এই ফেসবুক আইডিটি হ্যাক করে ফেলে। এই আইডির মেসেঞ্জারে গিয়ে সে বুঝতে পারে সে আরো অনেকের মতই শ্রাবন্তীর মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছে। এই আইডি থেকে এসে শ্রাবন্তীর অরিজিনাল ফেসবুক আইডি এবং ছবি খুঁজে বের করে। হ্যাক করা সেই ফেসবুক আইডিতে শ্রাবন্তীর অরিজিনাল ছবি আপলোড করে একটি পোস্ট দেয়।

পোস্টে বলা হয় “এই মেয়েটিকে কে কে চেনেন? তার আত্মীয়স্বজন কেউ যদি এই আইডিতে যুক্ত থাকেন তাহলে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করো। মেয়েটি একটি কঠিন খেলায় মেতেছে, অসংখ্য ছেলের জীবন নষ্ট করেছে এই মেয়ে। প্রমাণ চাইলে যোগাযোগ করো”। এই মেসেজ দেখার পরে শ্রাবন্তির এলাকার অনেকেই হ্যাক আইডির ইনবক্সে যোগাযোগ করে এবং সৌরভ সবার কাছে সকল প্রকার স্ক্রিনশট এবং তথ্য ছড়িয়ে দেয়। এখানে এসে থেমে থাকেনি, সে শ্রাবন্তীর বান্ধবী মৌসুমিকে খুঁজে বের করে এবং মৌসুমিকে জানায় তোমার বান্ধবী শ্রাবন্তীর তোমার ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন জনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং এ বিষয়ে সকল প্রমাণ ও সে সরবরাহ করে। রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে সেদিন মৌসুমী তার কয়েকজন আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে শ্রাবন্তীর বাসায় গিয়ে এ ব্যাপারে বকাঝকা এবং গালাগালি করে আসে। সে রাতেই শ্রাবন্তী আত্মহত্যা করে। মামলা হয় মৌসুমী এবং তার বন্ধু বান্ধবের বিরুদ্ধে।

গ্রেফতারের পর সৌরভ সকল ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

একদিকে নিজের কাছের বান্ধবী শ্রাবন্তীর মাধ্যমে এভাবে প্রতারিত এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় পলাতক মৌসুমী। অন্যদিকে দুই বছর প্রেমের পর প্রতারিত সৌরভ আসল ঘটনা জানতে পেরে তার প্রতিশোধ নেয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সবকিছুর মূলে ছিল শ্রাবন্তী, আর সেই শ্রাবন্তী যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নিল তখন সম্পূর্ণ ঘটনা এমন জটিলভাবে পেচিয়ে গেল যে তার সূত্র উদঘাটন করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ।

আমরা জানি না শ্রাবন্তী আত্মহত্যা করার সময় কি ভাবছিল, সেকি মনে মনে সবার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল? সে কি তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পথ বেছে নিল? তা আমরা হয়তো কখনোই জানতে পারবো না। তবে আমাদের সমাজে বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা কিন্তু বিরল নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অগণিত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বেশিরভাগই হয়তো আমাদের কাছে রিপোর্টেড হয় না কিন্তু এর মাধ্যমে ভুক্তভোগির সংখ্যা কিন্তু সমাজে কম নয়।

সিএসপি/কেসিবি/৯ঃ৫৬পিএম

ট্যাগ :