সোমবার, ৫ এপ্রিল ২০২১, ২২শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : রাত ১০:২৮

নুরুল আবছার হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পাচ্ছেনা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোনাফ


প্রকাশের সময় :৩ মার্চ, ২০২১ ৬:২৫ : অপরাহ্ণ

সিএসপি নিউজ : সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আবছার হত্যাকাণ্ড থেকে কোনও ভাবেই রেহাই পাচ্ছে না উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মোনাফ,  ওসমান গণি চৌধুরী, আবু তাহের ও সারোয়ার সালাম। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশীট থেকে তাদের বাদ দিলেও নিম্ন আদালত যেমন তাদের বাদ দেয়নি তেমনি উচ্চ আদালতে গিয়েও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। নিম্ন আদালত তদন্ত কর্মকর্তার নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাখান করে ওই চার আসামিকে চার্জশীটভূক্ত করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির যে আদেশ দিয়েছেন তা উচ্চ আদালতও বহাল রেখে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তিরস্কার করেছেন।

২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাতে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আবছারকে। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে খুনের নিদের্শদাতা ও জড়িত হিসেবে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মোনাফ ও ইউপি চেয়ারম্যান আবছারের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ওসমান গণি চৌধুরী, আবু তাহের ও সারোয়ার সালামের নাম আসলেও তাদের বাদ দিয়ে বাকি ১৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান মোল্যা।
তদন্ত কর্মকর্তাদের এমন ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করে উচ্চ আদালতের বিচারকেরা বলেছেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে আদালত ও প্রসিকিউটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সত্য ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যা কোনোভাবেই আইন সমর্থিত নয়।’যদিও এরআগে বাদির আবেদেনের প্রেক্ষিতে ওই চারজনকে চার্জশীটে অন্তর্ভূক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়ন্তী রাণী রায়।
চট্টগ্রামের নিন্ম আদালতের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে তা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামিরা। এই আবেদেনের শুনানি শেষে রবিাবর হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আসামিদের আবেদন নাকচ করে দেন। আদালত বলেছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকেরা যে আদেশ দিয়েছেন, তাতে বেআইনি কিছু পরিলক্ষিত হয়নি।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাতে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় নলুয়া ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নুরুল আবছারকে। এ ঘটনায় নিহতের পিতা আহমেদ হোসেন মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়ে এবং রাজনৈতিক কারণে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মোনাফ, গত নির্বাচনের ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ওসমান গণি চৌধুরী, মো. সারওয়ার সালাম ও আবু তাহেরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান মোল্যা ২০১৮ সালে ১৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। তবে এজাহারভুক্ত আসামি মোনাফ, ওসমান গণিসহ ছয় জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করেন। এই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন বাদি। ওই নারাজি আবেদন আংশিক গ্রহণ করে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়ন্তী রাণী রায় আদেশে বলেছেন, মামলার আসামি জসিমউদ্দিনসহ পাঁচ আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং রাষ্ট্রপক্ষে ৩৪ জন সাক্ষীর ১৬১ ধারায় জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামি মোনাফ ও ওসমান গণি চৌধুরী জড়িত। এছাড়া ১৮ জন সাক্ষী আসামি মোনাফ, ওসমান গণি, আবু তাহের, সারোয়ার সালাম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মর্মে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামি ও সাক্ষীদের জবানবন্দিতে খুনের সঙ্গে এদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরেও কোন আইনবলে এবং কীভাবে চার্জশিট থেকে এদের অব্যাহতি দিতে তদন্ত কর্মকর্তা আবেদন করেছেন, তা আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আসামি জসিমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য না মিথ্যা, ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি হয়নি বা কবে থেকে শুরু হয়েছে তা বিচারিক আদালতের বিষয়। তদন্ত কর্মকর্তার এ ধরনের কর্মকাণ্ড অগ্রহণযোগ্য ও আইনবহির্ভূত। এতে উনার তদন্তকাজে স্পষ্ট অদক্ষতা ও অবহেলার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। সার্বিক পর্যালোচনায় মোনাফ, ওসমান, আবু তাহের ও সারোয়ার সালামের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪/১০৯ ধারার অপরাধ আমলে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান থাকায় তাদের চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হলো।
এই আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে রিভিশন করেন আসামিরা। কিন্তু ওই রিভিশন খারিজ করে দেয় আদালত। ওই আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে মামলা বাতিলের আবেদন করেন মোনাফ ও ওসমান গণি। আবেদনের পক্ষে কুমার দেবুল দে ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী শুনানি করেন। হাইকোর্ট মামলা বাতিলের আবেদন উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, ‘১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে কারো নাম আসার পর তাকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে উচ্চ আদালতেও আসামিদের আবেদন নাকচ হলো।’
এ বিষয়ে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আত্মস্বীকৃত মূল পরিকল্পনাকারীকে বাদ দিয়ে অন্য আসামিদের বিচার করার ঘটনায় ধারাবাহিক কাজে ছেদ পড়বে। তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতের একচ্ছত্র এক্তিয়ারের ওপর তথা মামলার বিচার কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছেন। এতে শুধু রাষ্ট্র ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না, ভিকটিমের আত্মা আমাদের বিচারিক মানসের প্রতি নিরন্তর অভিসম্পাত করতে থাকবে।
সাতকানিয়ায় আলোচিত চেয়ারম্যান নুরুল আবছার হত্যা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এমন জবানবন্দি দেন আসামি মো. জসিমউদ্দিন বলেছিলেন, ‘ওসমান মামু আমাদের বলে, নুরুল আবছার প্রফেসরকে খুন করতে কত টাকা লাগবে? তখন মোনাফ চেয়ারম্যানও আমাদের সামনে বসা ছিল। আমি শাহ আলমকে বলি, তুমি দরদাম ঠিক করো। শাহ আলম ৮ লাখ টাকা চায়। মোনাফ চেয়ারম্যান ও ওসমান মামু পরামর্শ করে ৬ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়। এর মধ্যে ২ লাখ টাকা অ্যাডভান্স দিতে রাজি হয়। মোনাফ চেয়ারম্যান তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে দুই বান্ডেল টাকা বের করে ওসমানের হাতে দেয়। ওসমান মামু টাকাগুলো আমাকে দেয়। আমি টাকাগুলো শাহ আলমকে দেই। মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ওসমান ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোনাফ আমাদের দিয়ে নুরুল আবছার চেয়ারম্যানকে হত্যা করিয়েছে।’
শুধু এই আসামি নন, আরো চার জন আসামি তাদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে খুনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে ওসমান ও মোনাফের নাম বলেছেন। কিন্তু চাঞ্চল্যকর এই খুনের পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ওসমান ও মোনাফকে বাদ দিয়ে বাকি ১৩ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার  হাসানুজ্জামান মোল্যা।
জানতে চাইলে নিহত নুরুল আবছারের স্ত্রী নলুয়ার বর্তমান চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পরও কতটুকু প্রভাবশালী হলে সাক্ষ্য প্রমাণে নাম আসার পর চার্জশীট থেকে তাদের নাম বাদ দিতে পারে এ মামলাটি একটি উদাহরণ। তবে আদালত আমাদের আবেদন শুনে তাদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এরপরও তারা প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।