সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ ২৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : বিকাল ৩:০৯

পটিয়ার ইউএনও অফিসে হুইপ সহোদরের জন্মদিনের আনন্দ আয়োজন!


প্রকাশের সময় :২০ এপ্রিল, ২০২০ ৬:৪৯ : পূর্বাহ্ণ

সিএসপি নিউজ: সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষ যখন করোনা ভাইরাস মহামারী আতঙ্কে আতঙ্কিত দেশের মানুষকে রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি জেলায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন ঠিক তখনই চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত হুইপের ভাই মজিবুল হক চৌধুরীর নবাবের জন্মদিনের কেক কেটে আনন্দ আয়োজন পটিয়া ইউএনও অফিসের টেবিলে।

মজিবুল হক চৌধুরী নবাব। তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই।

সাম্প্রতিক ক্যাসিনো ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী  তার ছেলে শারুনের নানা অপকাণ্ডের বিষয়টি মিডিয়ার সমালোচনার মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাইতে গিয়ে আশাহত হয়ে চুপচাপ থাকলেও থেমে নেই সহোদর নবাবের নবাবগিরি।

পটিয়ায় হুইপের নবাবি না থাকলেও ভাইয়ের নবাবির কারণে অস্থির এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রশাসন!

সেকারণে নবাবের সর্বত্র দাপট যেখানে-সেখানে। প্রায় সময়ই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখান। তবে গত ২ এপ্রিলের রাতের ঘটনাটি ছিল অন্যরকম।

ছবি: পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার টেবিলে নেতাকর্মীদের নিয়ে কেক কাটছেন বহুল আলোচিত হুইপের ভাই মজিবুল হক চৌধুরী নবাব।

মুজিবুল হক চৌধুরী নবাব যুব মহিলা লীগের সদস্য শাহানা আক্তার টিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সোজা পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা জাহান উপমার রুমে প্রবেশ করেন। সঙ্গে ছিল জন্ম দিনের কেক। নবাবের জন্মদিনে কেট কাটার অনুরোধ করলেন ইউএনওকে। করোনা পরিস্থিতিতে তার অফিসে কেক কাটার বিষয়ে তিনি বিব্রত ও অসহায়বোধ করলেও হুইপের ভাইয়ের জন্ম দিন বলে কথা! ইচ্ছা না থাকা সত্বেও শেষপর্যন্ত তিনি কেক কাটা অনুষ্ঠানে শরিক হলেন।

ঘটনার এখানে শেষ নয়, একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে নবাবকে তার কথিত বান্ধবী, পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ যুব লীগের সদস্য শাহানা আক্তার টিয়া খুব অন্তরঙ্গ ভাবে কেক খাইয়ে দিচ্ছে। টিয়ার মুখে মাস্ক নেই, মাস্ক ঝুলছে তার গলায়। নবাবের মুখেও নেই মাস্ক। দু’জনের মধ্যে গলায় গলায় ভাব ভাইরাল হওয়া ছবিই বলে দিচ্ছে। টিয়াই তার ফেসবুকে ছবিগুলো পোস্ট করেন!

করোনা পরিস্থিতিতে হুইপের ভাইয়ের এমন জন্মদিন পালনে ছবি এখন ভাইরাল। মুখরোচক বিভিন্ন কাহিনীও ডালপালা মেলেছে। হুইপের ভাই নবাবের এমন জন্মদিন উৎসব পালন স্থানীয় আওয়ামী লীগ- যুবলীগ- ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

শাহানা আক্তার টিয়া খুব অন্তরঙ্গ ভাবে কেক খাইয়ে দিচ্ছেন মজিবুল হক চৌধুরী নবাবকে

এ ব্যাপারে শাহানা আক্তার টিয়া বলেন, সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় নবাবসহ ত্রাণ বিতরণ করেছেন। বিকালে একই সঙ্গে ইউএনও অফিসে এসেছেন। কে যেন একটি কেক এনে দিলো, সেটা দিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নবাবের জন্মদিন পালন করেছি। কতদূর থেকে কেক কেটেছিলেন? এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন টিয়া।

পরে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এত সমালোচনা হবে তা বুঝতে পারেননি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে শাহানা আক্তার টিয়া বলেন, আমরা দুইজনই পরস্পরকে কেক খায়িয়ে দিয়েছিলাম। আমাকে যখন কেক খাওয়ায় তখন মাস্কটা মুখ থেকে গলায় নামিয়ে এনেছি। এতে দোষের কিছু দেখেন না বলে জানান টিয়া।

পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জাহান উপমা বলেন, গত ২ এপ্রিল আমি শান্তির হাটে অভিযান চালিয়েছি, ত্রাণ বিতরণ করেছি। রাত ১০টা পর্যন্ত অফিসে কাজে ব্যস্ত ছিলাম। আমার অফিসটি হুইপের ত্রাণ কাজেও ব্যবহার করা হয়। হুইপের পক্ষে তার ভাই ত্রাণ কাজ তদারকি করেন। রাত ৯টার দিকে কাজের ফাঁকে তারা একটা কেক কেটেছেন। ওই দিন নাকি হুইপ মহোদয়ের ভাইয়ের জন্মদিন ছিল! যারা সেখানে ছিল তারা সবাই ত্রাণ বিতরণকারী।আগের ঘটনায় তাকে জড়িয়ে লাভ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এক পর্যায়ে ইউএনও বলেন, এখন রাত সাড়ে ১১ টা। আমার অবস্থান দক্ষিণ খরনা গ্রামে। ফেসবুকের মাধ্যমে জেনেছি, এক মহিলা পরিবারসহ না খেয়ে আছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবারটিকে ত্রাণ দিতে এসেছি। আমাদের ভালো কাজগুলো তুলে ধরুন, যোগ করেন ফারজানা জাহান উপমা।

এ ব্যাপারে পটিয়া আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যেখানে মানুষ না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। সেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সামনে টেবিলে কেক কেটে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাইয়ের জন্মদিন পালন করে পটিয়াবাসীর সঙ্গে উপহাস করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রচার করেছেন ৫০ হাজার পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছেন। সে হিসাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে ২৫০ পরিবার ত্রাণ পাওয়ার কথা কিন্তু তা দেয়া হয়নি। এত ত্রাণ গেল কোথায় প্রশ্ন করেন নাসির উদ্দিন।

উল্লেখ্য পটিয়ায় উপজেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ২জন। মারা গেছে এক ৬ বছর বছরের এক শিশু। চলছে লকডাউন। স্থানীয় সংসদ সদস্য সামশুল হক ও তার পুত্রের দেখা নেই। ত্রাণ তৎপরতাও দেখা যায়নি। তবে মুজিবুল হক নবাব কিছু ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তার ছবি তুলে টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচারও করিয়েছে। এ প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে ত্রাণ তৎপরতা। ত্রাণ না পেয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও করছেন দুস্থ ও শ্রমজীবী গরীব মানুষজন।

ট্যাগ :