শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ ৩০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : সকাল ৯:০২

পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হতে পারেন শিক্ষার্থীরা


প্রকাশের সময় :২ আগস্ট, ২০২০ ৪:০৪ : অপরাহ্ণ

সিএসপি নিউজ : মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এসএসসি) সদ্য পাস করে যারা কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হতে পারেন। সাবধানতার সঙ্গে বই না কিনলে দ্বিতীয়বার বই কেনার প্রয়োজন হবে তাদের। সেক্ষেত্রে নতুন সংস্করণের বই কিনে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন বই বিক্রি নিয়ে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণেই এমনটা হতে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ‘সাহিত্য পাঠ’ (গদ্য ও কবিতা) ও ‘বাংলা সহপাঠ’ (উপন্যাস ও নাটক) বই কেনার ক্ষেত্রে সাবধান থাকা খুবই জরুরি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এ বই দুটিতে পরিমার্জন আসছে। এছাড়া এবারই প্রথম ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ (আইসিটি) বই বাজারজাত করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তুক বোর্ড (এনসিটিবি)। ফলে পুরাতন বইয়ে অনেক বিষয় থাকবে না। আর যারা পরীক্ষা দিয়ে আগেই কিনেছেন তাদের নতুন করে বই কিনতে হবে, অথবা সহপাঠীর নতুন বই থেকে মিলিয়ে নিয়ে বাদ পড়া অংশ সংগ্রহ করে লেখাপড়া চালিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের প্রতারণা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ‘সাহিত্য পাঠ’ (গদ্য ও কবিতা), ‘বাংলা সহপাঠ’ (উপন্যাস ও নাটক) ও ‘ইংলিশ ফর টুডে’ এ তিনটি বই এনসিটিবি নিজস্ব লেখক দিয়ে লিখিয়ে বিভিন্ন প্রকাশকদের মাধ্যমে ছাপিয়ে বাজারজাত করে আসছে। এ তিনটি বইয়ে এবার সংশোধন আসছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকদের সুপারিশের পর এ বছর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইটি নতুন করে সংযোগ করা হয়েছে। এই চারটি বই অফারিং পদ্ধতিতে ছাপিয়ে বাজারজাত করতে গত ২২ জুলাই দরপত্র আহ্বান করেছে এনসিটিবি।
তবে গত বছরের পুরাতন বই বাজারে এখনও বাধাহীনভাবে বিক্রির সুযোগ রয়েছে। করোনার কারণে গত বছর কাজ পাওয়া একমাত্র প্রকাশনী অগ্রণী প্রিন্টার্সকে সম্প্রতি পুরাতন বই বিক্রির অনুমতি দিয়েছে এনসিটিবি। করোনার কারণে বই বিক্রি করা যায়নি এমন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার মাসের জন্য এই অনুমতি দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে নতুন সংস্করণ ও পুরাতন সংস্করণের বই বিক্রিতে বাজারে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সাল পর্যন্ত একাদশ শ্রেণির বই বাজারজাত করতো এনসিটিবি। কিন্তু এনসিটিবির বই শিক্ষার্থীরা কিনতেন না। বাজারের নকল বই কিনে চালিয়ে নিতেন। ফলে প্রতি বছর লোকসান দিতে হতো এনসিটিবিকে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পুস্তুক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির আহ্বানে অফারিং পদ্ধতিতে বেসরকারিভাবে ১৭ জন প্রকাশকের মাধ্যমে বই বিক্রি শুরু হয় ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে। এ পদ্ধতিতে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টাকা রয়্যালিটি পায় সরকার।
২০১৭ সালে প্রকাশকদের চাপে বইয়ের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। ২০১৮ সালে দাম বাড়ানো হয়নি। গত বছর কাগজ, প্লেট, কালিসহ বই ছাপানো ও বাঁধাই উপকরণের দামও কম ছিল। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ও এনসিটিবির রয়্যালিটি না বাড়লেও বইয়ের দাম বাড়ানো হয়। এ কারণে গত বছর ১৭ জন প্রকাশক বইয়ে কাজ করতে অনাগ্রহ দেখায়। দরপত্র প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু অগ্রণী প্রিন্টার্স দরপত্র প্রত্যাহার না করায় একমাত্র প্রকাশক হিসেবে বই বিক্রির কাজ পায়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বাজারজাত করার মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন। তবে করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও চার মাস সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে নতুন বইয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে গত ২২ জুলাই। আগামী ৬ আগস্ট দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে দরপত্র খোলা হবে। কার্যাদেশ দেওয়ার দিন থেকেই বাজারজাতের অনুমতি দেওয়া হবে প্রকাশকদের।
কার্যাদেশ পাওয়ার পর কাজ পওয়া প্রকাশকরা নতুন বই বিক্রি করার প্রতিযোগিতায় নামবেন। কারণ সাহিত্য পাঠ (গদ্য ও কবিতা), বাংলা সহপাঠ (উপন্যাস ও নাটক) এ দুটি পুরাতন বই এবং ২২টি প্রকাশনীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বই বাজারে বিক্রির অনুমোদন রয়েছে আরও এক বছর।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বই এবার ১০ লাখ কপি প্রস্তুত করেছেন প্রকাশকরা। অনুমোদন বাতিল না করে কিংবা ক্ষতিপূরণ না দিয়েই এনসিটিবির মাধ্যমে এ বছর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন বই বাজারজাত করা হবে। এনসিটিবির দ্বৈতনীতির কারণে এই বই বিক্রিতেও শুরু হবে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা হবেন প্রতারণার শিকার।
শিক্ষার্থীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, এই পরিস্থিতিতে কী করা হবে জানতে চাইলে এনসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘কারোনার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। জুনের পর পুরাতন বই বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয় না। আমরা ২০১৯-২০২০ শিক্ষবর্ষের বই বিক্রির জন্য বর্ধিত সময় দিয়েছি। এই সময়ের পর পুরাতন বই বিক্রি করা হলে আমরা ব্যবস্থা নেবো। ’
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ২২ প্রকাশনীর বই বিক্রির বিষয়ে কী করা হবে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা বিষয়টা দেখবো। কীভাবে অনুমোদন দিয়েছিলাম, শর্ত অনুযায়ী সরকার যেকোনও সময় অনুমোদন বাতিলও করতে পারে। ঈদের পর বিষয়টা দেখবো। এখনও এক বছর সময় আছে কাল শুনেছি।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘বই বিক্রির জন্য সময় বাড়ানো হলো। আবার নতুন বই প্রকাশের জন্য টেন্ডারও করা হলো। বাংলা বই পরিমার্জন করা হচ্ছে। তাহলে এতদিনে যারা বই কিনেছে তাদের আবার বই কিনতে হবে। এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা। যেসব প্রকাশকরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বই ছেপেছে, তারা এখনও এক বছর বিক্রি করতে পারবে। অথচ নতুন করে বই ছাপতে এনসিটিবি দরপত্র আহ্বান করেছে। তাহলে শিক্ষার্থীরা কোন বই কিনবে? নতুন বই কিনলে ব্যবসায়ীদের বইয়ের কী হবে? এসব করা হচ্ছে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থী এবং প্রকাশকরা।’
তিনি অভিযোগ করেন, একজন প্রকাশককে লাভ করিয়ে দিতেই এত কিছু করা হচ্ছে।
অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে লেখক ও সিসটেক পাবলিকেশন্সের মালিক মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘বই ছাপা ও বিক্রির অনুমোদন নিয়ে নানা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি লোকসানে পড়বে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনও আলোচনা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (এনসিটিবি) একাধারে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি।’
উল্লেখ্য, আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে কলেজে ভর্তি শুরু হবে। বছর বাংলা, বাংলা সহপাঠ ও ইংরেজির প্রতিটি বই ৯ লাখ ৬০ হাজার কপি করে মুদ্রণ ও বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিলো। এ বছর ১০টি লটে মোট ৪০ লাখ বই ছাপানো হবে।