শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সময় : সন্ধ্যা ৭:৫৩

বিদেশী বন্ধুরা, দেখুন! আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কি অটল, সংগ্রাম আর তাগের মন্ত্রে কত উজ্জীবিত; কার সাধ্য ইহাদের রোখে?


প্রকাশের সময় :১৮ মার্চ, ২০২১ ১১:৪৫ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানঃ
মুজিব-ইয়াহিয়া দ্বিতীয় বৈঠকের পর বৈঠকের পরবর্তী দিন ধার্য না হওয়ায় জনমনে শংকা ও অসহিষ্ণুতা দুটিই দেখা যায়। ১৮ই মার্চে জনতা সকাল থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ভিড় জমাতে থাকে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি শত শত সাংবাদিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেন : বিদেশী বন্ধুরা, দেখুন! আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কি অটল, সংগ্রাম আর তাগের মন্ত্রে কত উজ্জীবিত; কার সাধ্য ইহাদের রোখে? জনগণের দাবীর চাপে পড়ে সামরিক সরকার একটা তদন্ত কমিশন গঠন করে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু তীব্র বিরোধিতা করেন। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানেও রাজনৈতিক নেতারা ভূট্টোর দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে এককাট্টা হন। অবস্থা বেগতিক দেখে ভূট্টো বাংলাদেশে আগমন বাতিল করেন।

এ গণবিস্ফোরণ মেশিনগানেও স্তদ্ধ করা যাইবে না- বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডীস্থ বাসভবন একন মুক্তিকামী জনতার তীর্থকেন্দ্র। স্বাধিকারকামী বাংলার মানুষের অসহযোগ আন্দোলনের ধারাক্রমে আবালবৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সমাজের সর্বপর্যায়ের মানুষের সেখানে যেন ঢল নামিয়াছে। জাতীয় জীবনের বর্তমান সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ও জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে দইি-দফা বৈঠকের পর তৃতীয় বৈঠকের কোন সময় ধার্য না হওয়ায় গণমনে কিছুটা জিজ্ঞেস জাগায় গতকাল ভোর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত উৎসুক জনতা ভিড় জমাইতে থাকে নেতার বাসভবনে। শপথদীপ্ত চাত্র যুবক, নার্স, ব্যাঙ্ক কর্মচারী, নার্সিং স্কুল ও কলেজেন ছাত্রী, ট্রাক ড্রাইভার- প্রভৃতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের সংগ্রামী মানুষের মিছিল আসিয়া নেতার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করিয়া প্রতিদানে তাঁহার আশীর্বাদ কামনা করে।

সারাদিন ধরিয়া আনাগোনাকারী বিদেশী সাংবাদিকদের দৃষ্টি এইসব মিছিলের প্রতি আকর্ষণ করিয়া নেতা আবেগভরা কণ্ঠে এক পর্যায়ে বলেন : বিদেশী বন্ধুরা, দেখুন! আমার দেশের মানুষ আজ প্রতিজ্ঞায় কি অটল, সংগ্রাম আর তাগের মন্ত্রে কত উজ্জীবিত; কার সাধ্য ইহাদের রোখে? তিনি বলেন : আমার দেশ আজ জাগিয়াছে, জনগণ জাগিয়াছে, জীবন দিতে শিখিয়াছে। স্বাধীনতার জন্য জীবন দানের অগ্নিশপথে দীপ্ত জাগ্রত জনতার এ জীবন জোয়ারকে, প্রচন্ড এ গণবিস্ফোরণকে স্তদ্ধ করিতে পারে এমন শক্তি মেশিনগানেরও আজ আর নাই। বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন : ভোর ৫টা হইতে রাত্রি পর্যন্ত আপনারা কেবল এ দৃশ্যই দেখিতে পাইবেন।

একর পর এক তাঁহার বাসভবনে সমাগত শোভাযাত্রীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণদান প্রসঙ্গে প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণায় মুক্তি-সংগ্রামের পতাকা আরও উর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া এদেশের আপামর মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলার মানুষ, তোমরা ঘরে ঘরে সংগ্রামের দুর্গ গড়ে তোল। আঘাত যদি আসে, প্রতিহত করো, পাল্টা আঘাত হানো।’

তিনি বলেন, ৭ কোটি শোষিত-বঞ্চিত বাঙালীর সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকিবে। চরম ত্যাগের বিনিময়ে হইলেও হলেও আমরা লক্ষ্যে পৌছিবই। জনগণকে সুশৃংখল ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে। —-। তিনি বলেন, দরকার হইলে রক্ত দিয়াই আমরা দাবী প্রতিষ্ঠিত করিব তবু শহীদের রক্ত বৃথা যাইতে দিব না। তিনি বলেন, দাবী আদায় করিতেই হইবে। শান্তিপূর্ণভাবে হলে ভালে নইলে সংগ্রামের দুর্গম পথ ধরিয়াই আমরা লক্ষ্যস্থলে গিয়া পৌঁছিব।

এ তদন্ত কমিশন চাহি নাই
বিগত ২রা মার্চ হইতে ৯ই মার্চ পর্যন্ত সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় কি পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনের সাহায্যার্থে সামরিক বাহিনী তলব করা হইয়াছিল সে সম্পর্কে তদন্তের জন্য ‘খ’ এলাকার সামরিক আইন প্রশাসক গত বুধবার যে ৫-সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা দিয়াছেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান উহার উপর মন্তব্য করিতে গিয়া গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন যে, এহেন তদন্ত কমিশন আমরা চাহি নাই। আমরা চাহিয়াছিলাম সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত। এই হেতু সামরিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিযুক্ত এই কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা না করার জন্য তিনি তিনি সকলের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন। বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি দুঃখিত যে, যেই তদন্ত কমিশনের কথা ঘোষণা করা হইয়াছে উহা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ হইতে আমার উত্থাপিত দাবীর পরিপুরক নয়।

একটি সামরিক নির্দেশবলে এই কমিশন গঠন এবং সামরিক র্কর্তৃপক্ষের কাছেই উহার রিপোর্ট দাখিলের বিধান অত্যন্ত আপত্তিকর। কমিশনের বিবেচ্যসূচীই মূল ইস্যুর পূর্বাহ্নিক বিচার এবং আসল ইস্যুর তদন্ত না করার মতলব ফাঁস করিয়া দিয়াছে। একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হইতেছে “মার্চ মাসের ২ তারিখ হইতে ৯ তারিখের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় যে পরিস্থিতিতে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাহায্যার্থ সেনাবাহিনী তলব করা হইয়াছিল উহা নির্ধারণ করা। সুতরাং দেখা যাইতেছে বেসামরিক প্রশাসনিক মহলের সাহায্যার্থ নয় বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই সেনাবাহিনী তলব ও শক্তি প্রয়োগ করা হইয়াছিল কিনা উহা তদন্ত করিতে হইবে বিধায় মূল বিষয় সম্পর্কে শুনানীর আগেই বিচার করিয়া রাখা হইয়াছে।’—।

মুজিব সকাশে ওয়ালি খান
ন্যাপ প্রধান খান মোহাম্মদ ওয়ালি খান গতকাল সকালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডীস্থ’ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। বেলুচিস্তান ন্যাপের সভাপতি জনাব গউস বক্স বেজেঞ্জো জনাব ওয়ালি খানের সঙ্গে ছিলেন।

ভূট্টো আসিতেছেন না-
পিপল্স পার্টি প্রধান জনাব জেড. এ. ভূট্টো১৮ই মার্চ করাচীতে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহয়া খানশাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে আলোচনার জন্য তাঁহাকে শুক্রবার ঢাকা গমনের যে আমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন, তিনি তাহাতে অস্বীকার জ্ঞাপন করিয়াছেন। জনাব ভূট্টোবলেন যে, তিনি ঢাকা হইতে কয়েকটি ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাহিয়াছিলেন। কিন্তু‘ এ যাবৎ তিনি কোন জবাব পান নাই, এমতাবস্থায় আগামীকাল ঢাকা গমনের ফলে কোন উদ্দেশ্য সাধিত হইবে বলিয়া তিনি মনে করেন না।

উস্কানীমূলক যথেচ্ছাচার বন্ধ করুন
আওয়ামী পার্লামেন্টারী পার্টির ডেপুটি লিডার এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন : ইহা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের উপর্যপুরি প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপ বর্ধিত পরিমাণে অব্যাহত রহিয়াছে। আমরা জানিতে পারিলাম, যশোর-খুলনা রোডে এবং ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে সেনাবাহিনীর লোকেরা সম্পূর্ণ বিনা কারণে নিরস্ত্র অসামরিক লোকজনকে হয়রানী করিতেছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাহাদের উপর নির্যাতন চালাইতেছে। আজ (১৮ মার্চ) সকালে ঢাকা বিমান বন্দরের নিকট দিয়া কতিপয় নিরস্ত্র শ্রমিক ট্রাকে করিয়া যাওয়ার সময় সেনাবাহিনীর লোকেরা তাহাদের উপর বল প্রয়োগ করে এবং মেহের আলী নামক একজন শ্রমিক তাহাদের হাতে গুরুতর আহত হইয়াছে।—-।

সোনার বাংলা শশ্মান কেন?
পুঁথি-পত্রে, নাটকে-নভেলে, গল্প-কাহিনীতে এবং প্রবাদ ও প্রবচন বাক্যে বাংলার রূপৈশ্বর্যের যে কাহিনী লিপিবদ্ধ রহিয়াছে, তাহা আজ নিতান্তই রূপকথার মত শোনায়। বাংলার উদার মাঠ, উদাস প্রকৃতিতে আজ দীনাহীনা কাঙ্গালিনীর বেশ। কিন্তু‘ কেন? একদিন যে বাংলায় মানুষের গোলঅভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, বাগান ভরা তরকারী ছিল, সে আজ কেন দিনান্তে একবেলাও পেট ভরিয়া খাইতে পায় না? কেন এখানকার জীবন আজ এত বেশি অভিশপ্ত? কেন বাংলার জীবনে আজ শান্তি নাই, স্বস্তি নাই, স্ব”ছন্দ্য নাই- আছে শুধু অভাব, আর আছে শুধু অনটন? ———। (উপসম্পাদকীয়)

লাহোরে রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য
পাকিস্তানকে বিভক্তির ভূট্টোর অভিসন্ধি বিনাচ্যালেঞ্জে যাইতে দেওয়া হইবে না
দেশৈর দুই অংশের দুইটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জেড. এ. ভূট্টোর দাবীকে লাহোরের রাজনৈতিক মহল শোকাবহ ও দুঃখজনক বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তাঁহারা বলেন, দেশের দুই অংশকে আলাদা করার এই প্রচেষ্টাকে বিনা চ্যালেঞ্জে যাইতে দেওয়া হইবে না। তাহাদের মতে দুই দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবীর মুখে দেশের অখন্ডতার জন্য জনাব ভূট্টোর উদ্বেগের কথা অস্বাভাবিক।

তাঁহার প্রস্তাবের একমাত্র এই অর্থই করা যাইতে পারে যে, ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি এমন কি জাতীয় স্বার্থের মূলেও কুঠারাঘাত করিতে পারেন। তাঁহারা বলেন, পাকিস্তানের জন্য সামগ্রিকভাবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে, দুই অংশের জন্য পৃথক পৃথকভাবে হয় নাই। কাজেই জাতীয় পরিষদে একটি মাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকিতে পারে। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ দলসমূহ’ কথা বলা পরস্পর বিরোধী বলিয়া তাঁহারা উল্লেখ করেন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ভূট্টোর বক্তব্য আরও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত- ভাসানী
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আজ চট্টগ্রামে বলেন যে, দেশের দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য জনাব ভূট্টো যে সুপারিশ করিয়াছেন, সে ব্যাপারে তাঁহার বক্তব্য আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী বলেন, তাঁহার ৮৯ বৎসর বয়সে অতীতের সব কয়টি আন্দোলনের সহিত তিনি জড়িত ছিলেন। কিস্তু একটি সার্বজনীন দাবীতে জনগণের মধ্যে বর্তমান সময়ের মত একতা ও সহযোগিতা তিনি আর কখনো দেখেন নাই।

আরো পড়ুনঃ
বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া দু দিনের আলোচনায় কোন ফল আসেনি, বঙ্গবন্ধুর জবাব আলোচনা চলবে
৫২তম জন্মদিনে আপনার সব চাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কি?বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জবাব,‘জনগণের সার্বিক মুক্তি’

লেখকঃ পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

ট্যাগ :