শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সময় : রাত ৯:০৯

বুলেট-বেয়নেট দ্বারা কখনও সাড়ে ৭ কোটি বাঙালীর দাবীকে স্তদ্ধ করা যাইবে না-বঙ্গবন্ধু


প্রকাশের সময় :২১ মার্চ, ২০২১ ১০:৩৩ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান:
১৯৭১ সালের ২১ মার্চও বঙ্গবন্দুর সাতে ইয়াহিয়ার অনির্ধারিত বৈঠক হয়। কিš‘ বঙ্গবন্ধু আন্দোলনকে অব্যাহত রাকার মাধ্যমে একটি সিগনাল দেন যে, আলোচনা তেমন ফলপ্রসু হচ্ছে না। ওইদিন ভূট্টো বাংলাদেশে আসেন এবং কড়া নিরাপত্তায় বিমানবন্দর তেকে হোটের ইন্টারকন্টিনেন্টালে যান। প্রেসিডেন্টের সাথে তার বৈঠকের ফলাফল জানান হয় নি। দেশব্যাপী অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে-

ইয়াহিয়া-মুজিব অনির্ধারিত বৈঠক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান গতকাল সকালে ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। প্রায় ৭০ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠকে শেখ সাহেবের পক্ষে ছিলেন জনাব তাজউদ্দিন আহমদ। আওয়ামী লীগ প্রধান এবং প্রেসিডেন্ট আজ আবার বৈঠকে মিলিত হইবেন বলিয়া আশা করা যাইতেছে।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক শেষে শেখ সাহেব স্বীয় বাসভবনে ফিরিয়া সাংবাদিকদের জানান যে, এই বৈঠক আকস্মিক বা আশ্চর্যজনক কিছু নয়। পূর্ববর্তী আলোচনায় উদ্ভুত কতিপয় বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা গ্রহণের প্রয়োজনেই গতকল্যকার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, গত শনিবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা শেষে স্বীয় বাসভবনে ফিরিয়া বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানাইয়াছিলেন যে, তিনি সোমবার আবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হইবেন। তথাপি গতকল্য উভয়ে বৈঠকে মিলিত হওয়ার তাৎপর্য সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব সাংবাদিকদের জানানইহা আকস্মিক বা আশ্চর্যজনক কিছু নয়। প্রেসিডেন্ট ঢাকায় আছেন, আমিও ঢাকায় আছি। যখনই কোন ব্যাখ্যার দরকার হইবে আমরা একে-অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে পারি। ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই।

আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে মুজিবঃ
গতকল্য বিকালে শেখ মুজিবর রহমানের ধানমন্ডীস্থ বাসভবনে সমবেত এক বিরাট জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দানকালে শেখ মুজিব বলেন যে, বাংলা দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকিবে। শেখ মুজিব বলেন, নীতির প্রশ্নে কোনই আপোষ নাই এবং আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত পরিস্কার। তিনি জনসাধারণকে দাবী আদায়ের জন্য চুড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। শেখ সাহেব জনগণের মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাইয়া বলেন যে, বুলেট-বেয়নেট দ্বারা কখনও সাড়ে ৭ কোটি বাঙালীর দাবীকে স্তদ্ধ করা যাইবে না। তিনি বলেন, শহীদদের রক্তদান বৃথা যাইবে না এবং জনগণের চুড়ান্ত বিজয় অবশ্যই হইবে।

শেখ মুজিব বলেন, আমরা বহু রক্ত দিয়াছি এবং প্রয়োজন হইলে আরও ত্যাগ স্বীকার করিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করিব। বাংলা দেশকে আর কলোনী ও বাজার রাখা যাইবে না। তিনি গুজব ও বিভেদ সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকিয়া আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, সৃশৃংখল ও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অবশ্যই সাফল্যমন্ডিত হইবে।

‘হঠ যাও, সব কুছ্ ঠিক হো যায়েগা’-
ঢাকায় ভূট্টোঃ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক
বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সম্পর্কে আলোচনাকল্পে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার অভিপ্রায় অনুসারে পেপল্স পার্টি প্রধান জনাব জুলফিকার আলি ভূট্টো গতকাল (রবিবার) বিকালে সদলবলে করাচী হইতে ঢাকা আসিয়া পৌছেন এবং সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টভবনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দুইঘন্টা স্থায়ী বৈঠকে মিলিত হন। এই সময় তৃতীয় কেউ উ্পস্থিত ছিলেন না। এই বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায় নাই। তবে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকশেষে জনাব ভূট্টো বলেন, সব কিছু ঠিক হইয়া যাইবে।

ইহার আগে গতকাল বিকালে কঠোর সামরিক প্রহরার ছত্র”ছায়ায় জনাব ভূট্টো ঢাকা বিমানবন্দর হইতে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আগমন করেন। স্টেনগানধারী সেনাবাহিনী বিমান বন্দরের চাদে ও আশে-পাশে সর্বত্র টহল দিয়া বেড়াইতে থাকে। বিমান বন্দরের সকল প্রবেশপথ বন্ধ তাকায় সাংবাদিকদের পক্ষেও ভূট্টোর ধারে কাছে যাওয়া সম্ভব হয় নাই। অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর জনৈক বিদেশী সাংবাদিক বিমান বন্দরের মূল ভবনে প্রবেশ করিতে সক্ষম হইলেও সেনাবাহিনীর লোকজন অচীরেই তাহাকে বাহির করিয়া দেয়।—-।

জনাব ভূট্টোর গাড়ির বহর বিমান বন্দরের গেট পার হইয়া রাস্তায় নামার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে সামরিক বাহিনীর জীপের পুরোভাগে দন্ডায়মান জনৈক আর্মি অফিসার হুঙ্কার দিয়া উটেন, ‘হঠ যাও’। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ভূট্টোকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনার্থ সমাগত পশ্চিম পাকিস্তানী ছাত্র ও ব্যবসায়ী মিলিয়া ৫৭ ব্যক্তি পথ ছাড়িয়া দূরে ছিটকাইয়া পড়ার মত সরিয়া দাঁড়ায়।—।

এদিকে পিপিআই জানায়, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া হোটেলে ফিরিয়া জনাব ভূট্টো পিপিআই প্রতিনিধিকে বলেন যে, সব ঠিক হইয়া যাইবে। এই মুহুর্তে আমি এইটুকুই বলিতে পারি।

ওইদিন দৈনিক ইত্তেফাক নিন্মোক্ত নিবন্ধটি প্রকাশ করে যা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়:

শেখ মুজিব বাংলা দেশে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী
অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্যময় ১৪শ দিনের এই আনন্দপূর্ণ মুহূর্তে একটি ভাষ্য প্রদান করা প্রয়োজন যাতে ঘটনাগুলো একটি যথাযথ দৃষ্টিকোণে আনয়ন করা যায়। গত পক্ষকালের মধ্যে যেসব কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আমুল পরিবর্তন ঘটেছে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং সাড়ে ৭ কোটি অধিবাসী অধ্যুষিত বিশ্বের এই অংশের শান্তি ও স্থায়িত্বের প্রতি হুমকি প্রদান করে আন্তঃআঞ্চলিক সম্পর্কের ব্যাপারে আর একধাপ নতুন অবনতির সূচনা করেছে।

এই বিরাট রাজনৈতিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এই ঘটনাক্রমের মধ্যে নিহিত যে, ইসলামাবাদে অবস্থিত একটি দূরাবিগম্য প্রতিনিধিত্বহীন সরকারের কাছে থেকে বন্দিত্ব ও দাসত্বের নিগড় থেকে। রাজনৈতিক মুক্তির জন্য এটা হলো একটি চরম রাজনৈতিক সংগ্রাম। একটি সম্পূর্ণ এক পক্ষকাল যাবৎ ইসলামাবাদে অবস্থিত সরকারের আদেশ-নির্দেশ কেবলমাত্র ক্যান্টনমেন্টগুলো ব্যতীত পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও কাজ করেনি।

এল, অপেনহেয়িম তাঁর বিখ্যাত “আন্তর্জাতিক আইন” নামক পুস্তকে সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন এবং এই সার্বভৌমত্বে যে-কোন পার্থিব ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সার্বভৌমত্বের এই সার্বজনীন স্বীকৃতি ব্যাখ্যার বলে শেখ মুজিবর রহমান গত ১৪ দিন যাবৎ পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে ৭ কোটি জনগণের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

শেখ মুজিবর রহমান জনগণের কাছ থেকে বৈধভাবে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ ক্ষমতা আইনানুগভাবেই প্রয়োগ করছেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌমত্বের আইনতঃ অনুমোদন তিনি এই কারণে প্রার্থনা করেন নি যে, তিনি এখনো পর্যন্ত আশা করেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করছেন যাতে একটি যৌথ শাসন ব্যবস্থার অধীনে সার্বভৌম অংশীদার হিসাবে অঞ্চল দু’টো সহ-অবস্থান করতে পারে।

সামরিক কর্মচারীবৃন্দ কর্তৃক শাসিত হবে এমন পাকিস্তানের জন্য জনগণ সংগ্রাম করেনি এবং পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে পরিস্থিতিটি আরো বেশী আপত্তিজনক। কেননা, অধিকাংশ সামরিক কর্মচারীই এই দেশের সন্তান নন। আজকের পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী প্রধানতঃ পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারাই গঠিত।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এখন নিজস্ব কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। হয় তাকে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রাখতে হবে, বিচ্ছিন্ন তার হাত থেকে দেশ রক্ষা করতে হবে অথবা সংযুক্ত পাকিস্তানের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট হিসাবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে হবে। বাস্তবিক পক্ষেই সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে এবং বন্দুক বা বেয়নেট নয়, কেবলমাত্র দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অক্ষন্ন রাখতে পারে। যদি ইতিহাসের পটভূমিতে তিনি আন্তঃআঞ্চলিক সম্পর্কের দিকে দৃষ্টিপাত করেন তা হলে একমাত্র তিনিই মহান দূরদৃষ্টি ও উচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শনে সক্ষম হবেন যা এই সংকট নিরসন করতে পারবে।

সংযুক্ত পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সার্বভৌম চুক্তিপত্র
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান জন্মলাভ করে। দুইটি অঞ্চলের জনগণের দ্বিপক্ষীয় সার্বভৌমত্বের উপর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা  স্থাপিত হয়। এটাই ছিল মৌল চুক্তিপত্র যার উপর বিস্তর ব্যবধানে অবস্থিত দুইটি অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাধারণ সুবিধা ও সাধারণ কল্যাণের জন্য এটা ছিল একটি রাজনৈতিক সম্মিলন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সংখ্যালঘিষ্ঠ অঞ্চল পশ্চিম পাকিস্তানে রাজধানী অবস্থানের বিষয়টি স্বীকার করে একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে যে উদারতা প্রদর্শন করেছিল তা ছিল রাষ্ট্র ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। পূর্ব পাকিস্তান সংসদীয় পরিষদের সদস্য হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় আর্ধ-ডজন নেতাও নির্বাচিত করেছিল। এমনকি ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের বৈধ অধিকারও ত্যাগ করেছিল এবং আইন পরিষদ ও চাকুরী-বাকুরীতে সংখ্যাসাম্য মেনে নিয়েছিল এবং করাচীতে রাজধানী অবস্থানের বৈষম্য স্বীকার করে নিয়েছিল।

ত্যাগের পুরস্কার
একটি যৌথ রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার জন্য এই উদার ত্যাগের কি পুরস্কার পাওয়া গেলো? পুরস্কার পাওয়া গেলোঃ দীর্ঘ ২৩ বৎসরকাল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য রাজনৈতিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামরিক বন্ধ্যাত্ব, সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা।

বিখ্যাত ফ্রান্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান দার্শনিক দ্য টককুইভিলি তাঁর বিখ্যাত “আমেরিকার গণতন্ত্র” পুস্তকে বলেছেন, “গণতান্ত্রিক সরকারের সম্পূর্ণ ধারণাটি সংখ্যাগরিষ্ঠের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমৈত্ব দ্বারা সংগঠিত।” কিন্তু পাকিস্তানে যে গণতন্ত্র পুষ্টিলাভ করেছে তাকে সঠিকভাবে “সংখ্যাগরিষ্ঠের বঞ্চনা” হিসাবে অভিহিত করা যায়।

আমলা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সাহায্যে এবং করাচীতে রাজধানী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে আমলা গোলাম মোহাম্মদ যখন অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কায়েদ-ই-আজমের সর্বাধিক বিশ্বস্ত সহচর প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনকে ক্ষমতাচ্যূত করে, পাকিস্তানের উপর স্বৈরতন্ত্রের অভিশাপ প্রবর্তনের মাধ্যমেই এই দুষিত আবহাওয়ার সূচনা হয়। তার দুইজন সহকর্মী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। একজন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অন্যজন একটি নগ্ন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে গোলাম মোহাম্মদ অপেক্ষা ভাল কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেননি। পাকিস্তান অর্জনের ব্যাপারে কোন প্রত্যক্ষ অবদান ছাড়াই তিনজনেই ক্ষমতা দখলের জন্য ষড়যন্ত্র এবং অভ্যুত্থানকেই নির্বিঘ্ন উপায় হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।

আইয়ুব খানের অভ্যুত্থান
আইয়ুব খান একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেন। রাজনৈতিক নেতারা রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করেন এবং সেহেতু সামরিক অফিসার বা সরকারী কর্মচারীরা নয় (পেশাগত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করার সুযোগ এদের রয়েছে) বরঞ্চ রাজনৈতিক নেতারাই হলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধ উত্তরাধিকার।

পূর্ব পাকিস্তানের দুঃস্বপ্ন
আইয়ুব শাসনের সাড়ে দশ বছর পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য ছিল একটি দুঃস্বপ্ন। ঘটনাচক্রের গতিধারা অনুসারে পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগণের উপর তিনি তাঁর বন্দুকের শাসন ক্ষমতা বৃদ্ধি বা মন্থর করেছিলেন।

সামরিক শাসনের ঠিক পরদিনই গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক নেতাকেই মিথ্যা ও কাল্পনিক মামলায় কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা হয়। পূব পাকিস্তানের দুইজন রাজনীতির জনক শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকৈ তাদের বৃদ্ধ বয়সে অমানসিক নির্যাতনের লক্ষ্যবš‘ হিসাবে পরিণত করা হয়। গত ৩০/৪০ বৎসরকাল রাজনৈতিক জীবনের যাবতীয় সাফল্য অর্জনের জন্য জনগণ ছিল এই দুই নেতার প্রতি কৃতজ্ঞ। ফজলুল হককে অন্তরীণ করা হয় এবং সোহরাওয়ার্দীকে কারাগারে পাঠান হয়। তিনি বিদেশে এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে ইন্তেকাল করেন। এই রাজনৈতিক নিপীড়ন তখনই সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয় যখন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর যোগ্য উত্তরাধিকার শেখ মুজিবর রহমানকে কারান্তরালে থাকাকালীন তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামী করা হয়।

এই সময়ের মধ্যে বহু নেতা, জানা-অজানা ছাত্র ও শ্রমিকরা রক্তপাত করেছেন এবং কারাদ- ভোগ করেছেন। এইসব বছরে প্রস্ফুটিত যৌবনে স্ত্রী-পুত্রের প্রেম ও স্নেহ-বঞ্চিত তারা কারা-প্রাচীরের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন। তাঁদের নিঃসঙ্গতায় নির্যাতন ও লাঞ্ছনা ৭ম স্বর্গ দ্বারে পৌঁছতে পারতো, কিন্তু‘ আইয়ুব কানে তা পৌঁছায়নি।

কার্ল মার্ক্সের কাছে লেখা একটি চিঠিতে এ্যাঞ্জেলস্ যথার্থই বলেছেন, “নিজেদের আস্থা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভীত জনগণের দ্বারা প্রয়োজনীয় বর্বরতা সম্পাদনের মাধ্যমেই প্রধানত: আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।”

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ
এই তিক্ত আন্ত: আঞ্চলিক সম্পর্কের পটভূমিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিজ্ঞা করেন। এক ইউনিট ভেঙ্গে দিয়ে এবং এক লোক এক ভোটের সার্বজনীন গণতান্ত্রিক নীতি প্রবর্তন করে তিনি সত্যিকারভাবে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তিনি ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের একটি নব যুগের জন্য জাতির হৃদয়ে এইসব পদক্ষেপ খুব উচ্চ আশার সঞ্চার করে।

অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো যে, পিপল্স পার্টির নেতা জনাব জেড. এ. ভূট্টো জাতীয় পরিষদ বর্জন করার হুমকি প্রদান করেন এবং এই অবস্থায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অকস্মাৎ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। গত পক্ষকাল যাবৎ পূর্ব পাকিস্তানে যা কিছু ঘটেছে তার সবই ছিল অকস্মাৎ অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার ফলশ্রুতি।

মুজিব বনাম ভূট্টো
ইতিহাসের পটভূমিতে শেখ মুজিবর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভূট্টোর রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মৌল গুণগত প্রার্থক্য রয়েছে। ভূট্টো দীর্ঘ আট বৎসরকাল আইয়ুব খানের ক্যাবিনেটে মন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট অংশটি আইয়ুবের প্রাসাদ নির্মাণের কাজে ব্যয় করেন।

পক্ষান্তরে, শেখ মুজিবর রহমান শোষণ ও বঞ্চনার হাত থেকে তাঁর জনগণকে মুক্ত করার সংগ্রামে আইয়ুবের কারান্তরালে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। জনগণের কল্যাণের জন্য সম্ভবত: পাকিস্তানের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের “ফাঁসির মঞ্চে আমি গেয়ে যাবো জীবনের জয়গান” গেয়ে ফাঁসির মঞ্চে যেতেও রাজী আছেন। তাঁর জনগণের মুক্তির লক্ষ্য অর্জন অথবা সংগ্রামের মাধ্যমে জীবনপা্ত এই উদ্দেশ্যে তিনি উৎসর্গীকৃত এবং এই লক্ষ্যই তাঁকে মুক্তিদাতা হিসাবে প্রতিপন্ন করেছে।

শৃংখলা ও দাসত্ব থেকে তাঁর জনগণের মুক্তির জন্য শেখ মুজিব তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জন করেছেন। রাজনীতিতে তার উত্থান উল্কার মত, কেননা তিনি ছিলেন একটি স্বৈরাচারী শাসনের উৎপীড়নের দ্বারা মেঘাচ্ছন্ন আকাশে আলো ও মুক্তির দিকে সংকেতদানকারী একটি দেদীপ্যমান তারকা। তাঁর অনর্গল বাগ্মিতা, তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা সর্বোপরি তাঁর নি:স্বার্থতা ও অসম সাহস তাঁকে তাঁর সময়কালের কাহিনীর নায়ক করে গড়ে তুলেছে। তাঁর জনগণের স্বাধিকারের জন্য তিনি হৃষ্টমনে যে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন তাই তাঁকে দান করেছে অপরিসীম আত্মিক শক্তি।সত্যিকার সাধু পুরুষ ম্যাথ্যু বলেছেন, “সত্য কারণের জন্য যাঁরা নির্যাতন ভোগ করে তাঁরাই সৌভাগ্যবান।”

পশ্চি পাকিস্তানের জনগণ শেখের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা পরিমাপের কোন সুযোগই পায় নি। নিয়ন্ত্রিত সংবাদের মাধ্যমে আইয়ুব খান শেখের সঠিক ধ্যান-ধারণা ধ্বংস করার জন্য সব কিছুই করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলে, স্বীয় অকপটতা, সাহস এবং ত্যাগের মাধ্যমে শেখ সহজেই পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করতে পারবেন। সেটাই হবে পাকিস্তানের মুক্তি ও গণতন্ত্রের উষা-লগ্ন এবং জনগণের প্রচ্ছন্ন সৃজনী শক্তি বিকশিত হওয়ার জন্য অপরিসীম সুযোগ লাভ করবে এবং একটি শক্তিশালী সংযুক্ত এবং সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসাবে পাকিস্তান নবযুগে পদার্পণ করবে।—।

লেখকঃ পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

ট্যাগ :