সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : ভোর ৫:২১

মুজিব কিল্লা প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে


প্রকাশের সময় :২২ আগস্ট, ২০২০ ৫:১১ : অপরাহ্ণ

সিএসপি নিউজ : সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া ১ হাজার ৯৫৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মুজিব কিল্লা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে ২০১৮ সালে। একই বছরের ৯ অক্টোবর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়। সাড়ে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে প্রায় দুই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি। কেন হয়নি, তা খতিয়ে দেখতে ১২ আগস্ট গঠিত হয়েছে সংসদীয় কমিটি। কমিটি গঠনের পর আরও ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত (২১ আগস্ট) লিখিত কোনও চিঠি বা সার্কুলার পাননি কমিটির প্রধান এবং সদস্যরা। ফলে কাজ শুরু করতে পারেনি ওই কমিটি। কবে নাগাদ চিঠি বা সার্কুলার তারা হাতে পাবেন, আর কবে কাজ শুরু করবেন, আর কবেই বা প্রতিবেদন দেবেন তা এখনও অনিশ্চিত। প্রকল্প এবং কমিটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৮ সালে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রকল্প মেয়াদের প্রায় দুই বছর অতিক্রম হলেও কেনও এর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি, এক্ষেত্রে কী জটিলতা তৈরি হয়েছে, কোথায় কী অনিয়ম রয়েছে, তা চিহ্নিত করার জন্য সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

সংসদ সূত্রে জানা গেছে, মুজিব কিল্লা প্রকল্পের অগ্রগতি ও সর্বশেষ অবস্থা খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ময়মনসিংহ-১ আসনের সংসদ সদস্য জুয়েল আরেং ও ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘শুনেছি কমিটি হয়েছে। আমি এখন পর্যন্ত গঠিত কমিটি বিষয়ক কোনও সার্কুলার বা চিঠি হাতে পাইনি। কাজেই চিঠি বা সার্কুলার না পেলে কাজ শুরু করবো কীভাবে। চিঠি পাওয়ার পরেই কমিটির অপর সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ শুরু করবো।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল মাসুদ জানান, ‘সার্কুলার বা চিঠিতেই উল্লেখ করা থাকবে কত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। চিঠিতে উল্লেখ করা কমিটির কার্যপরিধি দেখেই বলতে পারবো যে ঠিক সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো কিনা।’

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যেকোনও দুর্যোগে বিশেষ করে বন্যায় জানমাল রক্ষায় ব্যবহার হবে মুজিব কিল্লা। অন্য সময় মুজিব কিল্লাগুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে। খেলার মাঠ ও হাট-বাজার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। গ্রাম ও ইউনিয়ন কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি এসব কিল্লায় সম্পাদন করা যাবে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটি উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈঠক বা সভা আয়োজন করা যাবে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় অনুষ্ঠেয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সর্বোপরি দুর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন বা দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে এই মুজিব কিল্লা।

জানা গেছে, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ও কয়েক লাখ প্রাণী মারা যায়। পরবর্তীতে স্বাধীনতা উত্তরকালে তথা ১৯৭২ সালের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার হাত থেকে জানমাল রক্ষার্থে অনেক মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এগুলো নির্মিত হওয়ায় সর্বসাধারণের কাছে এটি ‘মুজিব কিল্লা’ নামে পরিচিতি পায়। সেই সময় তিনি বাংলাদেশের মানুষকে দুর্যোগ সহনশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মিত সেই কিল্লাগুলো পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও বেদখল হয়ে যায়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে গড়ে তোলা মুজিব কিল্লাগুলো দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলা এবং সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে এসব মুজিব কিল্লা সংস্কার ও উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতি বছরই বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বস প্রভৃতি দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৬৯ জন মানুষ নিহত হয়। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে নিহত হয় ৩ হাজার ৩৬৩ জন এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় নিহত হয় ১৯০ জন। এছাড়া ২০১৩ সালে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় মহাসেন, ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুতে উপকূলীয় জেলাগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০০ এবং ২০০৪ সালের বন্যায় দেশের ৩৯ জেলার ২৬৫টি উপজেলায় জানমালের বিপুল ক্ষতি হয়েছিল।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের নেওয়া প্রকল্পের আওতায় ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ১৮৬টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে আপাতত ৫৫টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে এবং ১৩১টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ১৭১টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে ৬৩টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কার করা হবে এবং ১০৮টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ১৯৩টি মুজিব কিল্লা রয়েছে। এরমধ্যে ৫৪টি বিদ্যমান মুজিব কিল্লা পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে এবং ১৩৯টি নতুন কিল্লা নির্মাণ করা হবে। কিল্লার আশপাশে বীজ ও উদ্যান (বনায়ন) করা হবে ১ লাখ ১০ হাজারটি। এছাড়াও কিল্লার কাজে ব্যবহারের জন্য অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামাদি কেনা হবে ৫৭৯টি।
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক সুব্রত পাল চৌধুরী বলেন, ‘৫৫০টি মুজিব কিল্লা তো একসঙ্গে হবে না। এটি হবে পর্যায়ক্রমে। তবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে ১০০টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। এরমধ্যে ৬৫টি প্রকল্পের টেন্ডার হয়ে গেছে। ৩০টি প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ১২টি প্রকল্পের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। লে-আউট হয়ে গেছে ৩টি প্রকল্পের। আশা করছি, এই মাসের মধ্যেই অন্তত ২০টি প্রকল্পের লে-আউট করা সম্ভব হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সুব্রত পাল চৌধুরী বলেন, ‘ভবন জাতীয় কিছু না উঠলে তো দৃশ্যমান হবে না। সংসদীয় কমিটি তো ঠিকই বলেছে। চলতি বছরের মধ্যেই প্রকল্পটি শতভাগ দৃশ্যমান হবে। তবে পুরো কাজ শেষ করতে অর্থাৎ ৫৫০টি মুজিব কিল্লা নির্মাণে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরেও সময় বাড়ানো লাগতে পারে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘দেশের ৮টি বিভাগের ৩৮টি জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৬টি জেলার ৬৪টি উপজেলা এবং বন্যাপ্রবণ ও নদীভাঙন এলাকায় ১২টি জেলার ৮৪টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এসব স্থানে আগে থেকেই মুজিব কিল্লাগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। সম্প্রতি প্রকল্পের ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে। নতুন প্রকল্প পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেসব সমস্যা ছিল, তা এখন আর নেই। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।’