শনিবার, ৩ এপ্রিল ২০২১, ২০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : সন্ধ্যা ৬:৫০

শিরোনাম

সর্বাপেক্ষা কম রক্তপাতের মাধ্যমে যিনি চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করিতে পারেন, তিনিই সেরা সিপাহ শালার-বঙ্গবন্ধু


প্রকাশের সময় :২৩ মার্চ, ২০২১ ১১:৪৩ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানঃ
২৩শে মার্চ ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের স্মারক দিবস। লাহোর প্রস্তাব ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির একটি ঐতিহাসিক দলিল। কিন্তু‘ ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ বাঙালী জাতির কাছে অন্য পটভূমি নিয়ে হাজির হয়। বাংলাদেশে সেদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। অনুষ্ঠিত হয় কুচকাওয়াজ। বঙ্গবন্ধু সে অভিবাদন গ্রহন করেন। দু’একটি সংরক্ষিত স্থান ব্যতিরেকে বাংলাদেশে সেদিন নতুন জাতীয় পতাকা উত্তেলিত হয়। আর বঙ্গবন্ধু স্বীয় বাসভবনের সামনে জনসভায় ঘোষণা করেন আগামী দিনের কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার তাঁর উপর ছাড়িয়া দিতে। তিনি বলেন, সর্বাপেক্ষা কম রক্তপাতের মাধ্যমে যিনি চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করিতে পারেন, তিনিই সেরা সিপাহশালার। এর মাধ্যমে তিনি আন্দোলনের একটি অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত দেন। ওইদিন ভূট্টোকে এক হাত নেন পাকিস্তানী নেতারা।

আমরা শুনেছি ঐ, মাভৈঃমাভৈঃমাভৈঃ
’৭১ এর তেইশে মার্চের সুর
বিক্ষুব্ধ বাংলার বুকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের আঘাতে আঘাতে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের স্মারক দিবস২৩শে মার্চ গতকাল চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতায় আর পালিত হয় নাই। বাংলার মুক্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনের রক্তঝরা পটভূমিকায় ‘স্বাধীনবাংলা দেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ও ‘স্বাধীন বাংলা দেশ কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ’এর ডাকে গতকালের দিনটি বাংলা দেশব্যাপী‘ প্রতিরোধ দিবস’ হিসাবে পালিত হইয়াছে। বাংলা দেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারী বেসরকারী ভবন সমূহে, বাড়ী-ঘরে, যানবাহনে কালো পতাকার পাশাপাশি গতকাল সংগ্রাম পরিষদ পরিকল্পিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন করা হইয়াছে। ঢাকা শহরে সামরিক কড়া বেষ্টনীর ছত্র”ছায়ায় বিমান বন্দর ভবনটিতে পাকিস্তানের পতাকা উড়িতে দেখা যায়। সংরক্ষিত এলাকা প্রেসিডেন্ট ভবন লাট ভবনে পাকিস্তানের পতাকা ছিল।

এছাড়া রাজধানীর সকল সরকারী ভবন, সুপ্রীমকোর্ট, হাইকোর্ট, সেক্রেটারীয়েট, শেখ সাহেবের বাসভবন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা বেতারকেন্দ্র, টেলিভিশন কেন্দ্র প্রভৃুতস্থানে কালো পতাকার পাশাপাশি ‘স্বাধীন বাংলার’পতাকা উড্ডীন করা হয়। গতকাল প্রতিরোধ দিবস পালন উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকারগণ-জীবনে গণ-আন্দোলনের সাগরে ভরাকাটালের জোয়ার দেখা যায়।

ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আউটার স্টেডিয়ামে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ছাত্রছাত্রীরা যে বীরোচিত কুচকাওয়াজ পরিবেশন করেন, স্বাধিকার পিপাসু হাজার হাজার নরনারী আনন্দ উচ্ছল কিন্তু‘ বজ্রকঠোর শপথের দ্যুতিতে দীপ্ত এক অপূর্ব পরিবেশ তাহা অবলোকন করেন।—–

কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার উপর ছাড়িয়া দিন-শেখমুজিব
বিক্ষুব্ধ বাংলার দশ দিগন্তে সর্বাত্মক মুক্তি আন্দোলনের পটভূমিতে নয়া-আঙ্গিকে আবির্ভূত তেইশে মার্চের অবিস্মরণীয় দিনে বন্যার স্রোতের মত স্বীয়বাস ভবনে সমাগত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দানকালে স্বাধিকার আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, যতদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হইবে, যতদিন একজন বাঙালী বাঁচিয়া থাকিবে, এই সংগ্রাম আমাদের চলিবেই চলিবে। মনে রাখিবেন, সর্বাপেক্ষা কম রক্তপাতের মাধ্যমে যিনি চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করিতে পারেন, তিনিই সেরা সিপাহশালার।

তাই বাংলার জনগণের প্রতি আমার নির্দেশ সংগ্রাম চালাইয়া যান, সংগ্রামের কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার উপরই ছাড়িয়া দিন।’শেখ সাহেব আরও বলেন, বাংলার দাবীর প্রশ্নে কোন আপোষ নাই। বহু রক্ত দিয়াছি, প্রয়োজনবোধে আরও রক্ত দিব, কিন্তু‘ মুক্তিরলক্ষ্যে আমরা পৌছিবই। বাংলার মানুষকে আর পরাধীন করিয়া রাখা যাইবেনা।—–

মিঃ ভূট্টো ও তাঁর দোসর রাজানিয়ারা খুন-
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জেনারেল সেক্রেটারী মওলানা মুফতী মাহমুদ, পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও প্রেসিডেন্ট খান আবদুল ওয়ালীখান এবং বেলুচিস্তান ন্যাপের প্রেসিডেন্ট গউসবখস বেজেঞ্জো গতকাল ঢাকায় প্রদত্ত এক যুক্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন : পিপল্স পার্টিও চেয়ারম্যান উল্লেখ করিয়াছেন যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলি এবং সামরিক সরকারের মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান অবচলাবস্থার নিরসন করা যাইতে পারে। তিনি তাঁহার মতবাদ পুনরোল্লেখ করিয়া আরও বলিয়াছেন যে, বর্তমানে দেশে ক্ষমতার তিনটি উৎসই শুধু বিদ্যমান। এইগুলি হইতেছে আওয়ামীলীগ, পাকিস্তান পিপল্সপার্টি এবং সামরিক বাহিনী। তাঁহার এই মতবাদ সম্পূর্ণ ভুলধারণা ভিত্তিক অথবা দেশের সামনে যে সব সমস্যা রহিয়াছে সেগুলি সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ইইহার উদ্দেশ্য।আসল পরিস্থিতি এই যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিটের অবসানের পর এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে গঠিত একটি সার্বভৌম পরিষদসহ ৫টি প্রদেশ লইয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্র কায়েমের কথা ছিল। কিন্তু দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর জনসাধারণ যখন তাহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষা করিতেছিল, তখন হইতেই সেই সর্বসম্মত পরিকল্পনাটি বানচাল করিয়া দেওয়ার জন্য ভন্ডামীপূর্ণ প্রচেষ্টা শুরু হয়। জাতীয় পরিষদ কর্তৃক একটি জাতীয় সরকার গঠনের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনকে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র আখ্যা দিয়া এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেশের দুইঅংশে দ্বিধাবিভক্ত করার স্কিমের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদকে এড়াইয়া যাওয়ার চেষ্টা করা হইতেছে। এক ইউনিটের সেই মরা ঘোড়াকে পুনরুজ্জীবিত করাই ইহার উদ্দেশ্য।—

শেখ মুজিবের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের বৈঠক
গতকাল বিকালে ৬ জন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শেষোক্তের ধানমন্ডীস্থ’ বাসভবনে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক ৯০ মিনিট কালস্থায়ী হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবর্গ হইতেছেন : কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দওলতানা, ওয়ালি ন্যাপ প্রধান খান আবদুল ওয়ালি খান, জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টারী পার্টি ও প্রধান মওলানা শাহ্আহ্মদ নুরানী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মওলানা মুফতী মাহমুদ, পাঞ্জাব কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সরদার শওকত হায়াত খান এবং বেলুচিস্তান ন্যাপের সভাপতি জনাব গইস বক্স বেজেঞ্জো।—–

উপদেষ্টাপর্যায়ের বৈঠক
আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা গতকাল ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের সঙ্গে দুই দফা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজুদ্দিন আহমদ, ও ড. কামাল হোসেন এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বিচারপতি মিঃ এ. আর. কর্নেলিয়াস, লেঃ জেনারেল পীরজাদা, জনাব এস. এম. আহমদ ও কর্নেল হাসান যোগদান করেন।

কত ‘অটোনমি’ আপনাদের চাই!
পাকিস্তান মুসলীম লীগ সভাপতি খান আবদুল কাইয়ুম খান আজ রাওয়ালপিন্ডিতে বলেন যে, এক্ষণে পূর্ব পাকিস্তানী জনসাধারণকেই বলিতে হইবে দেশকে এক রাখিয়া কতখানি‘ অটোনমি’ তাঁরা চান।

কাইয়ুম খান ঢাকার পথে করাচী যাত্রার প্রাক্কালে ইসলামাবাদ বিমান বন্দরে সাংবাদিকদেও সহিত আলোচনা করিতে ছিলেন। তিনি আরও বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করিয়াছে যে, তাঁহারা ‘সর্বাধিক অটোনমিই’ প্রত্যাশা করেন। তবে ব্যক্তিগত ভাবে অভিমত প্রকাশ করিতে যাইয়া তিনি বলেন, এক্ষণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকেই বলিতে হইবে তাঁহারা কতখানি স্বায়ত্তশাসন চান এবং আমাদের সহিতই বা তাঁহারা সম্পর্ক বজায় রাখিতে চান।

পল্টনের জনসভায় একমনাদের প্রতি মশিহুর রহমান
ভাসানীপন্থী ন্যাপের জেনারেল সেক্রেটারী জনাব মশিহুর রহমান গতকাল বলেন যে, জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছুতেই বাঙালীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন করিতে কিংবা বিশ্বাস ঘাতকতা করিতে পারেন না।

ঢাকার পল্টন ময়দানে ন্যাপের ‘স্বাধীন পূর্ববঙ্গ দিবস’ উপলক্ষ্যে আহুত এক জনসভায় সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন যে, ‘দেশ ইতিমধ্যেই স্বাধীন হইয়াছে’ এবং যে কোন মূল্যে জনসাধারণকে এই স্বাধীনতা রক্ষা করিতে হইবে। জনসাধারণ এখন দুইটি সূত্র হইতে নির্দেশ লাভ করিতেছে সামরিক আইনের নির্দেশ এবং আওয়ামীলীগের নির্দেশ। জনসাধারণ কিন্তু‘ আওয়ামীলীগের নির্দেশই মানিয়া চলিতেছে। বর্তমানে ন্যাপের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও পরিস্কার অর্থাৎ তাহারা বাংলা দেশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করে।

জনাব মশিহুর রহমান বাঙালীদের মুক্তির জন্য সকল বামপন্থী দলগুলির প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণ-আন্দোলনকে সফল করিয়া তোলার জন্য এই ঐক্য গঠনের ব্যাপারে তাঁহাদের দল অন্যান্য বামপন্থী দলের সহিত“ অর্থবহ সংলাপ’ শুরু করিতে প্রস্তুত রহিয়াছে। বামপন্থী দলগুলির অতীতের মতবিরোধ এক্ষণে ভুলিয়া যাওয়া উচিত।—।

লেখকঃপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

ট্যাগ :