শনিবার, ৩ এপ্রিল ২০২১, ২০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : সন্ধ্যা ৬:৪৮

শিরোনাম

‘হয় আমরা মানুষের মত বাঁচিয়া থাকিব,নতুবা বাঁচিয়া থাকিবার জন্য সংগ্রাম করিতে করিতেই মৃত্যুবরণ করিব’-বঙ্গবন্ধু


প্রকাশের সময় :২৪ মার্চ, ২০২১ ৯:৩৬ : অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান:
১৯৭১ সালের পুরো মার্চ জুড়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে হাজার হাজার লোক সমবেত হতো। এ জন্য সমবেত জনতার উদ্দেশে প্রতিদিনই তাঁকে বক্তব্য দিতে হতো। ওইদিন তিনি হৃদয়স্পর্শী বেশ কিছু কথা বলেছেন। এর মধ্যে ‘হয় আমরা মানুষের মত বাঁচিয়া থাকিব, নতুবা বাঁচিয়া থাকিবার জন্য সংগ্রাম করিতে করিতেই মৃত্যুবরণ করিব’- অন্যতম। কী অভূতপূর্ব বিপ্লবী সে কথা! দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কী মরণপণ শপথ! ঊাংলার মানুষ তাই তাঁকেই বেছে নিয়েছে মরণপণ যুদ্ধের সিপাহসালার হিসেবে। ওদিকে উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকের ইতি টেনে প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চেয়ে বসেন তাজুদ্দীন আহমদ। এদিনের পত্রিকায় চট্টগ্রামের ‘অস্ত্র খালাস’ নিয়ে প্রতিবেদনটি অনেকের প্রকৃত ঘটনা জানতে সহায়তা করবে।

বাংলার উপর কোন কিছু চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা বরদাশত করা হইবে না- শেখ মুজিব
গতকাল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান তাঁহার ধানমন্ডীস্থ বাসভবনের সম্মুখে আগত অগণিত মানুষের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, বাংলা দেশের মানুষের উপর কোন কিছু চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করা হইলে উহা সহ্য করা হইবে না। শেখ মুজিব বলেন, আমাদের দাবী ন্যায্য ও স্পষ্ট এবং তা অবশ্যই মানিয়া লইতে হইবে। …।

সমবেত জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রসঙ্গে শেখ মুজিব বলেন যে, বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ এবং কোন শক্তিই জনতাকে দাবাইয়া রাখিতে পারিবে না। শেখ মুজিব বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই; কিন্তু তাহারা যদি তাহা না চান এবং জনগণকে দাবাইয়া রাখিতে চান- আশা করি এই ভুল করিবেন না। শেখ মুজিব বলেন, দাবী আদায় হইবে সে পর্যন্ত সংগ্রাম চলিবে। আপনারা শৃংখলাপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালাইয়া যান। তিনি আন্দোলনে শৃংখলার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। শেখ মুজিব বলেন, কিছুসংখ্যক লোক আমাদের সংগ্রামকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করিতেছে। তারা আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক গোলমাল বাধাইবার চেষ্টা করিতেছে। তাহাদের বহু কিছু আছে এবং তাহারা বাংলা দেশে গোলমাল বাধাইয়া বানরের পিঠা ভাগে অংশ নিতে চায়। এই প্রসঙ্গে তিনি সৈয়দপুরের ঘটনা উল্লেখ কওে বলেন, আমরা সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ যখন ঐক্যবদ্ধ, তখন কোন ষড়যন্ত্র আমাদের দাবাইয়া রাখিতে পারিবে না। আমরা যখন একত্র হইয়াছি তখন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হইতে বাধ্য। —।

শেখ মুজিব বলেন, কোন শক্তির নিকট আমরা মাথা নত করিব না। আমার মাথা কিনার শক্তি কারও নাই। বাংলার মানুষের রক্তের সাথে আমি বেইমানী করিতে পারিব না। আমি বুলেটের সম্মুখীন হইতে রাজী আছি, কিন্তু জনগণকে গোলাম থাকিতে দিব না। আমরা আর কোন অবিচার সহ্য করিতে রাজী নই। হয় আমরা মানুষের মত বাঁচিয়া থাকিব, নতুবা বাঁচিয়া থাকিবার জন্য সংগ্রাম করিতে করিতেই মৃত্যুবরণ করিব।

আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ- অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের ঘোষণা চাই- তাজুদ্দীন
বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনকল্পে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার মধ্যে যে সাধারণ ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সে ঐক্যমত্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য রচিত বিশদ কর্মপন্থা লইয়া গতকাল প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে পৌনে তিন ঘন্টার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ হইতে দুই ঘন্টার কিছু অধিক কাল কর্মপন্থাটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কর্মপন্থাটির কর্মপ্রয়োগ প্রসঙ্গে বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন না হইলে উপদেষ্টা পর্যায়ে আর আলোচনার প্রয়োজন আছে বলিয়া আওয়ামী লীগ মনে করে না। স্বীকৃত সত্যের আলোকে সঙ্কট নিরসনের জন্য অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের পক্স হইতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই এক্ষণে একমাত্র রাজনৈতিক অগ্রগতি বিবেচিত হইতে পারে বলিয়া মনে করা হইতেছে। এর ব্যতিক্রমের অর্থই হইবে সময় ক্ষেপণ বা বিকল্প প্রস্তুতি গ্রহণের নীতি।—-

প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে গুলী ও হাঙ্গামা
ঢাকার দায়িত্বশীল মহল হইতে জানা গিয়াছে যে, রংপুরে সেনাবাহিনীর লোকজন ও জনতার মধ্যে এক সংঘর্ষের পর গতকাল সেখানে সান্ধ্য আইন জারি করা হইয়াছে। এবং চট্টগ্রামে সামরিক সরঞ্জামবাহী জাহাজের মাল খালাসকল্পে প্রেরিত সেনাবাহিনীর গতিরোধ করার দরুন সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্তিতি বিরাজ করিতেছে এবং শেষ খবরে প্রকাশ, তথায় কয়েক রাউন্ড গুলীও বর্ষিত হইয়াছে। এদিকে মিরপুরে গত মঙ্গলবার রাত্রে গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে পুলিস শামীম আখতার নামধারী এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করিয়াছে। —-

টেলিভিশনে ধর্মঘটঃ অবিলম্বে সামরিক প্রহরীদের প্রত্যাহার দাবী
ঢাকা টেলিভিশনকেন্দ্রে নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর লোকজন অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যাপারে চাপ ও কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি এবং কর্মচারীদের সাথে দৃর্ব্যবহার করার প্রতিবাদে টি.ভি কর্মচারীগণসকল অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করিয়া প্রতীক ধর্মঘট পালন করেন।

এ তবে কিসের আলামত?
এ তবে কিসের আলামত? চরমতম সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান যখন সদলবলে ঢাকায় বসিয়া সাড়ে ৭ কোটি সত্যাগ্রহী বাঙালীর অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত চুড়ান্ত আলোচনায় রত এবং সে আলোচনার অগ্রগতির সংবাদে মানুষ যখন অনেকটা আশান্বিত, ঠিক তখনই আবার এ অশুভ সঙ্কেত কেন, গতকল্য রাজধানী ঢাকার গণমনে এ প্রশ্ন না জাগিয়া পারে নাই।

তেইশে মার্চেও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচী অনুযায়ী রাজধানী নগরীর মহল্লায় মহল্লায়, যার সরকারী অফিস-আদালতে ‘বাংলা দেশের পতাকা’ উড়িল, কোথাও কোন বিপত্তির কারণ ঘটিল না, অথচ মীরপুর হইতে সংবাদ আসিল ১০ নং সেকশনের একটি গৃহশীর্ষ হইতে ‘বাংলা দেশের পতাকা’ অপসারিত হইয়াছে, ভীতি প্রদর্শিত হইয়াছে, গভীর রাত্রে অসংখ্য বোমার আওয়াজ শ্রুত হইয়াছে, বাংলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব কাইয়ুম শরীরের তিন স্থানে ছোরার আঘাতসহ এবং ২ নং সেকশনের জনৈক প্রোঢ় বাঙালী পেটকাটা অবস্থায় হাসপাতালে নীত হইয়াছেন এবং একটি গৃহে অগ্নিসংযোগও করা হইয়াছে। —-

হুমকি!
পাঞ্জাম পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান শেক মোহাম্মদ রশিদ গতকাল লাহোরে সতর্ক করিয়া দেন যে, তাঁহার দলের সহিত আলোচনা না করিয়া কেন্দ্র সরকার গঠন করা হইলে তাঁহারা বর্তমান সরকারকে কোনদিনই ক্ষমা করিবেন না। তিনি আরও বলেন যে, পিপল্স পাটির বিরোধীরা তাঁহার দলকে ক্ষমতালোভী বলিয়া টিটকারী দিয়া থাকেন। কিন্তু তিনি বলেন যে, ক্ষমতালোভের অভিলাষী হওয়া তেমন অপমানজনক কিছু নহে। বস্তুত: ইহা গৌরবের ব্যাপার বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রামে গুলী
চট্টগ্রাম বন্দরে ১৭ নং জেটিতে অপেক্ষমাণ ‘সোয়াত’ জাহাজ হইতে গোলাবারুদ সামরিক বাহিনীর লোকেরা নামাইয়া লইয়া আসিবার প্রয়াস পাইলে বিপুল সংখ্যক জনতা ২৪ই মার্চ সন্ধ্যা হইতে তাহাদিগকে ঘেরাও করিয়া রাখিয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। প্রকাশ, প্রায় আটটি সামরিক ট্রাক বোঝাই সৈন্যরা স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র উঁচাইয়া জেটিতে অপেক্ষমাণ রহিয়াছে। অপরদিকে জনতাও প্রয়োজনীয় দূরত্বে থাকিয়া পথ আটকাইয়া রহিয়াছে। ইতিমধ্যে এই খবর ছড়াইয়া পড়ায় সঙ্গে সঙ্গে ডবলমুরিং জেটি এলাকা হইতে বায়জীদ বোস্তামী পর্যন্ত (ক্যান্টনমেন্ট এলাকা) প্রায় সাত মাইল দীর্ঘ রাস্তায় অসংখ্য বেরিকেড খাড়া করা হইয়াছে। যে সব রাস্তায় ব্যারিকেড উঠিয়াছে তম্মধ্যে এয়ারপোর্ট রোড, কায়েদে আযম রোড, মাদার বাড়ী রোড, স্ট্রাঙ্ক রোড, পাঠানটুলী, দেওয়ানহাট, ও. আর. নিজাম রোড ইত্যাদি। বহু সংখ্যক প্রাইভেট ট্রাক রাস্তার উপর কাত করিয়া শোয়াইয়া পিচ ভর্তি ড্রাম, ওয়াসার মোটা পাইপ, অকেজো লোহা-লক্কড় ও লক্ষ লক্ষ ইট-পাটকেল দিয়া রাস্তা অগম্য করিয়া ফেলা হইয়াছে।

উল্লেখ্য যে, ১৮০ টন অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ‘সোয়াত’ জাহাজটি গত ৫ই মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে আসিয়া ভীড়ে; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর শ্রমিকরা ঐ জাহাজ হইতে গোলাবারুদ নামাইতে অস্বীকার করে; ফলে ঐ গোলাবারুদ এতদিন জাহাজেই পড়িয়া ছিল। রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে গভীর উত্তেজনা বিরাজ করিতেছে। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, চট্টগ্রামে গুলী বর্ষিত হইয়াছে।

লেখকঃ পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

ট্যাগ :