বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, সময় : দুপুর ২:৩৯

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম-২


প্রকাশের সময় :৩১ মার্চ, ২০২১ ১২:১৬ : পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানঃ
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের বড়বড় প্রভাবশালী দৈনিক ও সাপ্তাহিক গুলো বড়বড় নিবন্ধ পরিবেশন করে। এর মাধ্যমে পশ্চিমা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণ বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারেন। ফলত: যুদ্ধকালে দেখা যায় পশ্চিমা অনেক দেশের সরকার পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও জনগণ বাংলাদেশকে সমর্থন করেছেন। তারা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলেছেন। ১৯৭১ সালের ১৫ই মার্চ প্রভাবশালী পত্রিকা‘ টাইম’ নিন্মোক্ত নিবন্ধটি প্রকাশ করে যা দৈনিক সংবাদ ১৯ শে মার্চ প্রকাশ করে।

‘টাইম’ পত্রিকার দৃষ্টিতে পাকিস্তানেরপরিস্থিতি
১৯৪৮ সালে জিন্নাহ বলেছিলেন আমরা যদি নিজেদেরকে প্রথমেই বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী এবং সিন্ধী বলে আর আমাদের মুসলমান এবং পাকিস্তানী হওয়াটা নেহায়েত ঘটনাচক্র বলে ভাবতে শুরু করি, তাহলে পাকিস্তান খন্ডবিখন্ড হতে বাধ্য।
১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পর তখনও খুন-খারাবিপূর্ণ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের রক্ত বয়ে চলেছিল । ঐ সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল উপরোক্ত আশঙ্কা। গেল সপ্তাহে আবার রক্তগঙ্গা বয়েছে। দুনিয়ার সব চাইতে জনবহুল দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থানীয় দেশটির (লোকসংখ্যা ১৩ কোটি) একটি ভাঙ্গন- কিংবা একটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাষ দেখা গেছে। দেশটি দুইঅঞ্চলে বিভক্ত। গম উৎপাদনকারী পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘকায় গৌরাঙ্গ লোকের বাস আর ধান উৎপাদনকারী পূর্বাঞ্চলে খর্বাকৃতি কৃষ্ণাঙ্গ লোকের বাস।

আসন্ন ভাঙ্গনের পিছনে যে ব্যক্তি রয়েছেনতিনি হচ্ছেন শেখমুজিবুর (“মুজিব”) রহমান। তিনি হচ্ছেন অপেক্ষাকৃত বেশী জনবহুল, দারিদ্র পীড়িত পূর্বাঞ্চলের অবিসম্বাধিত রাজনৈতিক নেতা। “পাকিস্তান আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তাতে তার শেষ হয়ে গেছে”- গত সপ্তাহে ঢাকার‘ টাইম’সংবাদদাতা ড্যান কগিনকে একথা বলেছেন মুজিব। তিনি বলেন, “আপোষ নিস্পত্তির আর কোন আশা নেই।”তিনিপূর্ব এবংপশ্চিম পাকিস্তানকে পৃথক পৃথক শাসনতন্ত্র গ্রহণ করার এবং নিজের সমর্থকদের প্রতি পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারকে ট্যাক্স দিতে অস্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন। মনে হয় তিনি, যাকে তিনি বাংলা দেশ (বেঙ্গল স্টেট) বলছেন, তার সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার একেবারে কিনারে চলে এসেছেন। বাংলা দেশ হইবে দুনিয়ার সব চাইতে জনবহুল দেশগুলির মধ্যে অষ্টম স্থানীয়। মুজিব যদি এই ধরনের একটা ঘোষণা করে বসেন, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য যুদ্ধও বেধে যেতে পারে। সেনাবাহিনীতে ৬০ হাজারের মতো সৈন্য রয়েছে, যাদের অধিকাংশই হচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলীয়।

দুস্তর ব্যবধান
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার ফলে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়এবং যে বিরোধ দুইবছর আগে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতনে সাহায্য করেছিল, বর্তমান সঙ্কট সে বিরোধেরই সম্প্রসারিত রূপ বলা যায়। আইয়ুবের উত্তরসূরী হচ্ছেন জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান-তিনি স্বেচ্ছাচারী হলেও পক্ষপাতহীন মনোভাবা সম্পন্ন। তিনি এই মর্মে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের আরও বেশী অধিকার থাকবে। একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের উদ্দেশ্যে তিনি গত ডিসেম্বরে গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এটাই ছিল পাকিস্তানের চতুর্থ নির্বাচন। ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন গণপরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনে শেখমুজিব ও তাঁর আওয়ামীলীগ ৬০টি আসন পাবেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাকী সদস্যরা পশ্চিম পাকিস্তানী দলগুলির সাথে মিলিত হয়ে মুজিবকে সমগ্র দেশের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনে বাধা দেবেন। কিন্তু‘ আওয়ামীলীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভকরে সমগ্র গণপরিষদেই সংখ্যাধিক্য অর্জন করেন। এই বিজয়ের মূলে ছিলপূর্ণ স্বাত্তশাসনের দাবী অথবা সরাসরি স্বাধীনতা।

নির্বাচনে ম্যান্ডেট লাভকরে মুজিব তাঁর‘ ছয় দফা’র উপর আরও জোর দিতে থাকেন। এই ‘ছয় দফা’য় দাবী করা হয়েছে যে, পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘ দিনের প্রভূত্বের অবসান ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তান নিজেই নিজের ট্যাক্স, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ‘এইড’ সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনা করবে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা হচ্ছে ৫ কোটি ৮০ লক্ষ। মুজিব অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিমাঞ্চল বৈদেশিক সাহায্যের শতকরা ৭০ ভাগ এবং আমদানীর শতকরা ৭০ ভাগ নিয়ে থাকে। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্বাঞ্চল পশ্চিমাঞ্চলের চাইতে অনেক এগিয়ে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের আমলাদের শতকরা ৮৫ ভাগ এবং সেনাবাহিনীর শতকরা ৯০ ভাগই পশ্চিমাঞ্চলের লোক। পূর্ব পাকিস্তান পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলির একটি-এখান কার জনসংখ্যা হচ্ছে ৭ কোটি ২০ লক্ষ। (পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি বর্গমাইলে ১৪০০ লোক বাস করে থাকে।) পূর্ব পাকিস্তান বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দরিদ্র দেশগুলির একটি -এখানকার মাথাপিছু বাৎসরিক আয় হচ্ছে ৫০ ডলার। পূর্ব পাকিস্তান বিশ্বের সবচাইতে বেশী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত দেশও বটে- গঙ্গা বদ্বীপে ঘূর্ণিবাত্যায় কমপক্ষে ৫ লক্ষ পূর্ব পাকিস্তানী নিহত হন।

পশ্চিম পাকিস্তানে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং তাঁর পাকিস্তান পিপল্সপার্টি বিপুল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হলেন। তারা ১৪৪টি আসনের ৮৩টি আসন দখল করলেন।
ধনী জমিদার পরিবারের সন্তান ৪৩ বৎসর বয়সের ভূট্টো চীনপন্থী এবং ভারত বিরোধী। পল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ৪৮ বৎসর বয়সের মুজিব পশ্চিমাপন্থী এবংভারতের সাথে শান্তি স্থাপনে অভিলাষী। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ পুঁজিপতি, আমলা এবং সামরিক অফিসার ভূট্টোকে সমর্থন করেন-যিনি ৬ দফা বিরোধী, কারণ ৬ দফা পন্থিরা পাকিস্তানের ঐক্য এবং তাঁর উচ্চাকাঙ্খাকে ধ্বংস করবে।

ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর মুজিব দু’বার পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত জাতীয় রাজধানীতে আহুত সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। ইয়াহিয়াপূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা গমন করলেন এবং ভূট্টোও তাই করলেন। কিন্তু‘ তাঁরা মুজিবের সাথে একমত হতে পারলেন না। তিনি কঠোর ভাবে হুশিয়ারী প্রদান করলেন যে, সংখ্যালঘুরা আর সংখ্যাগুরুদের শাসন করতে পারবেনা।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে একটি সমঝোতায় পৌছানোর সুযোগ দানের উদ্দেশ্যে ইয়াহিয়া গত সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য গণ-পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখলেন। গণ-পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণাটি বাঙ্গালীদেরকে ক্রুদ্ধ করে তুললো।

মুজিব ঘোষণা করলেন, “আমি পশ্চিম পাকিস্তানের উপর ৬-দফা আরোপ করছি না, বাংলাদেশের জনগণের জন্য তা প্রযোজ্য এবং তারা তা বাস্তবায়িত করবে।”মুজিব প্রতিবাদ স্বরূপ ঐ সাধারণ ধর্মঘট এবং সপ্তাহের অবশিষ্ট দিনগুলোর জন্য অর্ধ-দিবস ধর্মঘট আহ্বান করলেন। অফিস, দোকানপাট, কলকারখানা, রেল, বিমান, এমনকি রিকশা বন্ধ হয়ে গেল।

ক্রুদ্ধ জনতা মুজিব-নির্দেশিত অস্ত্র- বাশেঁর লাঠি নিয়ে ঢাকার ফাঁকা রাস্তায়“জয় বাংলা ধ্বনি তুললো। ঢাকায় সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে ২৫ জন প্রাণ হারালো, অপর ১০০ জন নিহত হল চট্টগ্রাম বন্দর শহরে।
মুজিব সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষনকে‘ ক্ষমাহীন অপরাধ ’বলে নিন্দা করলেন এবং হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বললেন, “তারা প্রত্যাহার না করলে জন যুদ্ধ শুরু হবে।”

সপ্তাহ শেষে ইয়াহিয়া খান বেতারে ঘোষণা করলেন যে, ২৫ শে মার্চ গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। “আমি যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক পদে বহাল থাকবো ততক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানের অখন্ডতার পুরোপুরি নিশ্চয়তা বিধান করবো।”এতদ সত্ত্বেও মনে হয় এ ব্যাপারে সন্দেহ করার আছে যে, ইয়াহিয়ার পরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত মুজিবকে শান্ত করতে পারবে। দু’দিন পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানী নেতা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সম্পর্কে বলেন, “আমি তাঁদের অনমনীয় মনোভাব ভাঙ্গবো এবং নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবো।” এই ধরনের উক্তির পর সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা এ্যান্টিক্লাইমেক্সের চাইতে তেমন বেশী কিছু আরকি হতে পারে। (টাইম, ১৫ই মার্চ, ’৭১)

লেখকঃপ্রকল্প পরিচালক, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর