শনিবার, ৩ এপ্রিল ২০২১, ২০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সময় : সন্ধ্যা ৬:২২

শিরোনাম

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালোরাত ও বেগম মুজিব


প্রকাশের সময় :২৭ মার্চ, ২০২১ ১০:২৯ : পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান:
১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী। এদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন যে, আজকের দিনটি আমি একান্তে অনুভব করতে চাই। কেন বলেছিলেন, সেটা পাঠক মাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। তাঁর প্রিয় দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাঁর প্রিয় মানুষেরা আজ স্বাধীন! কিন্তু‘ যে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে হানাদার পাকিস্তানী নরপিশাচরা, তাকি হৃদয়ে বহন করা যায়?একদিকে পরম আনন্দ, আরেক দিকে গভীর বেদনা রক্ষত।

এদিন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা দৈনিক বাংলায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি নতুন জানার জগৎ তৈরি করবে বলে মনে করছি।

প্রথম থেকেই ইয়াহিয়া পশুটাকে আমি বিশ্বাস করতাম নাঃ বেগম মুজিব
গত বছরের এই দিনের স্মৃতি চারণ করতে গেলে প্রথমেই আমার মন কেঁদে উঠে। সেই ভয়াল ২৫শে মার্চের কালোরাত থেকে ১৬ ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এদেশের পরিজন হারা লাখো লাখো পরিবারের কথা ভেবে অশান্ তহয়ে উঠে মন। তাই পৃথক করে হিংস্র এই রাতটার কোন কথা বলতে বা ভাবতে আমার মন সায় দেয় না। বললেন বেগম মুজিব।

কথা বলছিলাম ৩২ নং রোডের সেই বাড়ীটাতে। একটা বছর আগের একরাশ স্মৃতির ছায়ায় বসে বেগম মুজিব বলছিলেন অবিস্মরণীয় সেই ২৫ শে মার্চেররাত ও তারও আগেকার দিনগুলোর কথা। অসহযোগ আন্দোলনের সেই অনন্য দিনগুলো। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বাংলার মানুষ এক হয়ে গেছে। ঠিক এমনি মুহুর্তে আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে ইয়াহিয়া চক্র বাংলায় এলো। প্রথম থেকেই পাকিস্তানী নৃশংস এই পশুটাকে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না।

আলোচনা বৈঠকের প্রথম থেকেই এক অশুভ কালো ছায়াকে আমি যেন দেখতে পেয়েছিলাম সেদিনের জাগ্রত বাংলার অঙ্গনে। শেখ সাহেবকেও আমি বলেছিলাম যারা তাঁকে আগরতলা মামলায় জড়িয়েছে, তারা ভালোভাবেই জানে যে শেখ সাহেব বাংলাদেশ আর বাঙালীদের চিন্তা ভাবনাই করেন পাকিস্তান প্রশ্নে তাঁর আগ্রহ নেই। পাকিস্তানের ক্ষমতা তারা শেখ সাহেবকে দিবেনা। কাজেই আলোচনা আরম্ভ করে তারা অন্য কোন নতুন কৌশল বের করার সুযোগ খুঁজছে মাত্র। আমার কথা শেখ সাহেব শুনলেন। মুখে কিছুই বললেন না। তিনি দলীয় নেতাদের বৈঠক ছাড়া বাইরে তেমন কিছু বলতেন না তখন।

গত বছর ২৫ শে মার্চের সকাল থেকে বাড়ীর অবস্থা ভারভার লাগছিল। দুপুর তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আমাদের বাসার সামনে দিয়ে সৈন্য বোঝাই দুটো ট্রাক চলে গেল। দোতলা থেকেই ট্রাকগুলো দেখে আমি নিচে নেমে এলাম। শেখ সাহেব তখনও আগত লোকদের সাথে কথাবার্তায় ব্যস্ত। তাঁকে ভেতরে ডেকে মিলিটারী বোঝাই গাড়ী সম্বন্ধে বলতেই দেখলাম পলকের মধ্যে মুখটা তাঁর গম্ভীর হয়ে গেল। পরক্ষণেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। সমস্ত দিনটা কেটে গেল থমথমে ভাবে। এলোরাত। সেই অশুভ রাত।

রাত সাড়ে আটটায় তিনি সাংবাদিকদের বিদায় দিলেন। আওয়ামীলীগ সহকর্মীদেরও কিছু কিছু নির্দেশ দিয়ে দ্রুত বিদায় দিলেন।
রাতপ্ রায় ১০টার কাছাকাছি কলাবাগান থেকে এক ভদ্রলোক এসে শেখ সাহেবের সামনে একেবারে আছড়ে পড়লেন। তাঁর মুখে শুধু এক কথা আপনি পালান!বঙ্গবন্ধু পালান! ভেতর থেকে তাঁর কথাশুনে শঙ্কিত হয়ে উঠলো আমারও মন। বড় মেয়েকে তার ছোট বোনটা সহতার স্বামীর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম। যাবার মুহুর্তে কি ভেবে যেনো ছোট মেয়েটা আমাকে আর তার আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। শেখ সাহেব তার মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু বললেন বিপদে কাঁদতে নেই মা।

তখন চারদিকে সৈন্যরা নেমে পড়েছে। ট্যাঙ্ক বের করেছে পথে। তখন অনেকেই ছুটে আসছিলেন ৩২ নং রোডের এই বাড়ীতে। বলেছিল বঙ্গবন্ধু আপনি সরে যান। উত্তরে দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে ছিলেন তিনি না, কোথাও আমি যাবনা। রাত ১০টা থেকেই গোলাগুলী শুরু হয়ে গেল। দূর থেকে তখন গুলিরশব্দ ভেসে আসছিল। দেখলাম প্রতিটি শব্দ-তরঙ্গের সাথে সাথে শেখ সাহেব সমস্ত ঘরটার মাঝে পায়চারী করছিলেন। অস্ফুটভাবে তিনি বলছিলেন এভাবে বাঙালীকে মারা যাবেনা বাংলা মরবেনা। রাত ১২টার পর থেকেই গুলিরশব্দ এগিয়ে এলো। ছেলে মেয়েদের জানলা বন্ধ করতে যেয়ে দেখতে পেলাম পাশের বাড়ীতে সৈন্যরা ঢুকে পড়েছে। স্পষ্ট মনে আছে এই সময় আমি বাজের মতই এক ক্রুদ্ধ গর্জন শুনছিলাম গো অন, চার্জ—

সেই সাথে সাথেই শুরু হলো অঝোরে গোলাবর্ষণ। এই তীব্র গোলাগুলির শব্দের মধ্যেও অনুভব করলাম সৈন্যরা এবার আমার বাড়ীতে ঢুকেছে। নিরুপায় হয়ে বসে ছিলাম আমার শোবার ঘরটাতে। বাইরে থেকে মুসলধারে গোলাবর্ষণ হতে থাকলো এই বাড়ীটা লক্ষ্য করে। ওরা হয়তো এই ঘরটার মাঝেই এমনিভাবে গোলাবর্ষণ করে হত্যা করতে চেয়েছিল আমাদেরকে। এমনভাবে গোলাবর্ষণ হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল সমস্ত বাড়ীটা বোধহয় ধ্বসে পড়বে। বারুদের গন্ধে মুখ চোখ জ্বলছিল। আর ঠিক সেই দুরন্ত মুহুর্তটাতে দেখছিলাম ক্রুদ্ধ সিংহের মত সমস্ত ঘরটার মাঝে অবিশ্রান্ত ভাবে পায়চারী করছিলেন শেখ সাহেব। তাঁকে এভাবে রেগে যেতে কখনো আর দেখিনি।

রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে ওরা গুলী ছুড়তে ছুড়তে উপরে উঠে এলো। এতক্ষণ শেখসাহেব ওদেরকে কিছু বলেননি। কিন্তু‘ এবার অস্থিরভাবে বেরিয়ে গেলেন তিনি ওদের সামনে। পরে শুনেছি সৈন্যরা সেইসময়ই তাঁকে হত্যা করে ফেলতো যদি না কর্নেল দইহাত দিয়ে তাঁকে আড়াল করতো। ধীর স্বরে শেখ সাহেব হুকুম দিলেন গুলি থামাবার জন্য। তারপর মাথাটা উঁচু রেখেই নেমে গেলেন তিনি নিচের তলায়। মাত্র কয়েকমুহুর্ত। আবার তিনি উঠে এলেন উপরে। মেঝ ছেলে জামাল এগিয়ে দিল তাঁর হাতঘড়ি ও মানিব্যাগ।

স্বল্প কাপড় গুছানো স্যুটকেস আর বেডিংটা তুলে নিল সৈন্যরা। যাবার মুহুর্তে একবার শুধু তিনি তাকালেন আমাদের দিকে। পাইপ আর তামাক হাতে নিয়েই বেরিয়ে গেলেন তিনি ওদের সাথে। সোফার নীচ থেকে, আলমারীর পাশ থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকজন দলকর্মী। ওরা আস্তে আস্তে বললো মাগো আমরা আছি। আমরা আছি। ওদের সকলের মাঝে দাঁড়িয়ে সে-রাতে কেঁদে ফেলেছিলেন বেগম মুজিব। বলেছিলেন খোদার কাছে হাজার শোকর তোদের অন্তত ফেরৎ পেয়েছি। তোরা অন্তত: ধরা পড়িস নি। এই পর্যন্ত বলেই তিনি শেষ করলেন সেই রাত টার কথা।

লেখকঃপ্রকল্প পরিচালক, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর

ট্যাগ :